![]()
উন্নত জীবন, ভালো আয় ও নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় প্রতিবছর ইউরোপে পাড়ি জমান বিভিন্ন দেশের অসংখ্য মানুষ। তাঁদের অনেকের কাছে ইউরোপ মানেই উন্নত নাগরিক সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বচ্ছলতা। কিন্তু অভিবাসনের পর অনেকেই বুঝতে পারেন, উন্নত দেশের সুযোগ-সুবিধা থাকলেও সেখানে নিজের অবস্থান তৈরি করা সহজ নয়।
বিশেষ করে পর্তুগালের মতো দেশে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাড়িভাড়া, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাইরে থেকে প্রবাসজীবন যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, বাস্তবে অনেকের জীবন ততটাই সংগ্রামমুখর।
প্রবাসে কারও জীবনে আসে আর্থিক উন্নতি, আবার কাউকে প্রতিনিয়ত হিসাব মেলাতে হয় আয় ও ব্যয়ের। ফলে বিদেশে যাওয়ার আগে শুধু সম্ভাব্য বেতনের অঙ্ক নয়, সেখানে বসবাসের প্রকৃত খরচ ও জীবনযাত্রার বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বেতনের বড় অংশ চলে যায় বাড়িভাড়ায়
পর্তুগালে ২০২৬ সালে মাসিক ন্যূনতম বেতন ৯২০ ইউরো। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ১১ শতাংশ কর্তনের পর সাধারণ হিসাবে হাতে থাকে প্রায় ৮১৮.৮০ ইউরো। তবে কর ও অন্যান্য কর্তনের কারণে প্রকৃত প্রাপ্তি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
অন্যদিকে, বিশেষ করে লিসবন ও আশপাশের এলাকায় বাড়িভাড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় আয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করতে পারে। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ইন্টারনেট, খাবার, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ মেটানোর পর হাতে খুব বেশি অর্থ অবশিষ্ট না-ও থাকতে পারে।
পরিবার নিয়ে বসবাস করলে ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। সন্তানদের শিক্ষা, পরিচর্যা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ সামলাতে গিয়ে একজনের আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
মাসের শুরুতেই বেতনের বড় অংশ বাড়িভাড়ায় চলে গেলে বাকি টাকা দিয়ে সংসার চালানো, দেশে পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানো কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে।
তাই প্রশ্ন উঠছে, উন্নত জীবনের আশায় হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যে দেশে আসা, সেই জীবনযাত্রার সুযোগ কি সবার জন্য সমানভাবে সহজলভ্য?
নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্যের বাসায় ভাড়া
প্রবাসজীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ আবাসন। দেশে অনেকের নিজস্ব বাড়ি বা তুলনামূলক বড় বাসা ছিল। সেখানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজের মতো করে থাকার সুযোগও ছিল। কিন্তু বিদেশে এসে তাঁদের অনেককে অন্যের বাসায় একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকতে হয়।
ব্যয় কমাতে অনেক প্রবাসীকে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে রান্নাঘর ও বাথরুম ভাগাভাগি করতে হয়। কেউ কেউ একই ঘরে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে বসবাস করেন। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ে।
ব্যাচেলরদের জীবনেও রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ সময় কাজ করার পাশাপাশি নিজের খাবার তৈরি, কাপড় ধোয়া, ঘরের কাজ সামলানো এবং বাড়িভাড়ার হিসাব রাখতে হয়। অর্থ সাশ্রয়ের জন্য একসঙ্গে কয়েকজন থাকলেও ব্যক্তিগত স্বস্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ অনেক সময় কমে যায়।
সংসার চালাতে কাজে নামতে হয় স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই
অভিবাসনের পর অনেক পরিবারের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসে। দেশে কোনো কোনো পরিবারে স্বামী উপার্জন করতেন, আর স্ত্রী সংসার ও সন্তানদের দেখাশোনা করতেন। ঘরের কাজে সহযোগিতার জন্য গৃহকর্মী রাখার সামর্থ্যও ছিল কিছু পরিবারের।
কিন্তু বিদেশে এসে সংসারের ব্যয় সামলাতে অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই কাজে নামতে হয়। সন্তান থাকলে তাঁদের দেখাশোনার ব্যবস্থা করাও বাড়তি দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
কাজের সময়ের সঙ্গে শিশুর পরিচর্যা, স্কুলের সময়সূচি এবং পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনের সমন্বয় করতে গিয়ে তৈরি হয় মানসিক চাপ। কখনো কাজের সময় পরিবর্তন, কখনো সন্তানদের দেখাশোনার ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে দৈনন্দিন জীবন হয়ে ওঠে ব্যস্ত ও হিসাবনির্ভর।
কেউ কাজ না পেয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন, কেউ এক কাজ ছেড়ে অন্য কাজের সন্ধান করেন। আবার অনেকে নিজের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ না পেলেও সংসারের প্রয়োজনে অন্য পেশায় যুক্ত হন।
পরিবারের ব্যয় মেটাতে একাধিক সদস্যের উপার্জনের প্রয়োজন দেখা দেয়। ফলে বিদেশে গিয়ে শুধু ভালো আয় করাই নয়, পরিবারের সদস্যদের কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।
দেশে গৃহকর্মী রাখতেন, বিদেশে নিজেই শ্রমিক
অভিবাসনের বাস্তবতা বোঝাতে অনেকের অভিজ্ঞতাই সামনে আসে। দেশে কোনো কোনো পরিবারে ঘরের কাজে সহযোগিতার জন্য গৃহকর্মী থাকতেন। কিন্তু বিদেশে এসে সেই পরিবারের কাউকেই অন্যের বাসায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ, রেস্তোরাঁয় খাবার পরিবেশন, দোকান বা শপিংমলে কাজ কিংবা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।
তবে ঘরের কাজ, রেস্তোরাঁয় কাজ, দোকানে কাজ কিংবা নির্মাণশ্রম—কোনো সৎ পেশাই অসম্মানের নয়। প্রতিটি কাজই সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় এবং সম্মানের যোগ্য।
এখানে মূল পরিবর্তনটি পেশার মর্যাদায় নয়, বরং জীবনযাত্রার ধরনে। দেশে যে কাজ অন্যকে দিয়ে করানো হতো, বিদেশে এসে সেই কাজ নিজেকেই করতে হচ্ছে। আগে যিনি নিজের সুবিধামতো সময় কাটাতেন, এখন তাঁকে কাজের সময়, যাতায়াত ও আয়ের হিসাব মিলিয়ে চলতে হয়।
এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়। বরং দেশ বদলালে মানুষের সামাজিক অবস্থান, দায়িত্ব ও জীবনযাপনের ধরন কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, তারই প্রতিফলন।
তবু মানুষ ইউরোপে আসেন কেন?
এর উত্তর সবার জন্য এক নয়। কেউ উন্নত ভবিষ্যতের আশায় আসেন, কেউ সন্তানদের ভালো শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ দিতে চান। কেউ দেশে কর্মসংস্থানের অভাব কিংবা কম আয়ের কারণে বিদেশে পাড়ি জমান। আবার কেউ রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে আসতে চান।
অনেকের জন্য অভিবাসন ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে। তাঁরা ভালো আয় করেন, পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেন, ব্যবসা গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থার উন্নতি ঘটান। কেউ কয়েক বছরের পরিশ্রমে বাড়ি কেনেন, কেউ সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেন।
কিন্তু সবার অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। অনেকেই দীর্ঘদিন কাজ করেও প্রত্যাশিত সঞ্চয় করতে পারেন না। দেশে টাকা পাঠাতে গিয়ে নিজের প্রয়োজন কমাতে হয়। পরিবার সঙ্গে থাকলে ব্যয় বাড়ে, আর পরিবার দেশে থাকলে তৈরি হতে পারে একাকিত্ব ও মানসিক চাপ।
অর্থাৎ, ইউরোপে আসা মানেই সবার জীবন বদলে যাওয়া নয়। কারও জন্য এটি উন্নতির সুযোগ, কারও জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম, আবার কারও জন্য সুযোগ ও প্রতিকূলতার মিশ্র অভিজ্ঞতা।
শুধু বেতন নয়, হিসাব করতে হবে পুরো জীবনের
অভিবাসনের সাফল্য বিচার করতে শুধু মাসিক বেতনের অঙ্ক দেখলে হবে না। একজন কত আয় করছেন, তার পাশাপাশি কত টাকা বাড়িভাড়া দিতে হচ্ছে, পরিবারের পেছনে কত খরচ হচ্ছে, কত ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে এবং মাস শেষে কতটা সঞ্চয় থাকছে—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
কারও বেতন তুলনামূলক বেশি হলেও আয়ের অধিকাংশ বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচে শেষ হয়ে গেলে আর্থিক স্বস্তি সীমিত থাকে। অন্যদিকে, কম ভাড়ায় বাসা, স্থায়ী কাজ ও পরিবারের সহযোগিতা থাকলে তুলনামূলক কম আয়েও ভালোভাবে জীবন পরিচালনা করা সম্ভব।
তাই বিদেশে যাওয়ার আগে শুধু সম্ভাব্য বেতনের হিসাব করলেই চলবে না। বাড়িভাড়া, জীবনযাত্রার ব্যয়, কাজের সুযোগ, ভাষাগত দক্ষতা, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশেষ করে পরিবার নিয়ে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে আবাসন ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি আগে থেকেই পরিকল্পনায় রাখা জরুরি। কারণ, একজনের জীবনযাত্রার ব্যয় আর চার সদস্যের পরিবারের ব্যয় এক নয়।
জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোও জরুরি
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে শুধু ব্যক্তিগত সাশ্রয় দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মানুষের আয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি।
পর্তুগালসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আবাসনসংকট ও বাড়িভাড়ার চাপ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ী বাসার সরবরাহ বাড়ানো, শ্রমিকদের আয় ও কর্মপরিবেশ উন্নত করা, শিশুদের পরিচর্যার সুযোগ বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যূনতম বেতন বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু শুধু বেতন বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। একই সঙ্গে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য জরুরি ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার উদ্যোগও দরকার। অন্যথায় আয় বাড়লেও ব্যয়ের চাপে জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
এ ছাড়া অভিবাসীদের জন্য ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের তথ্য এবং আবাসনসংক্রান্ত সহায়তা নিশ্চিত করা তাঁদের নতুন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করতে পারে।
স্বপ্নের পাশাপাশি বাস্তবতাও বুঝতে হবে
মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে বিদেশে আসেন ভালো থাকার আশায়। কেউ পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চান, কেউ সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে চান, আবার কেউ নিজের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য পেতে চান। এসব স্বপ্ন স্বাভাবিক।
কিন্তু উন্নত দেশের নাগরিক সুবিধা আর ব্যক্তিগত জীবনের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য এক বিষয় নয়। কোনো দেশে উন্নত সড়ক, নিরাপদ পরিবেশ, আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা কিংবা সামাজিক সুরক্ষা থাকলেও সবার পক্ষে সেই দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করা সম্ভব নাও হতে পারে।
যে মানুষটি দেশে নিজের বাড়িতে পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতেন, বিদেশে এসে তাঁকে যদি বাড়িভাড়া মেটাতে প্রতিদিন হিসাব করতে হয়, অতিরিক্ত কাজ খুঁজতে হয় কিংবা পরিবারের সবাইকে উপার্জনের চাপে থাকতে হয়, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা নতুন করে ভাবতে শেখায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিদেশে আসা ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা প্রবাসজীবন মানেই ব্যর্থতা। বরং অভিবাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্বপ্নের পাশাপাশি বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
জীবনের সাফল্য শুধু বেশি আয় করা কিংবা বেশি ইউরো উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের ও পরিবারের জন্য নিরাপদ বাসস্থান, পর্যাপ্ত খাবার, মানসিক শান্তি, সম্মানজনক জীবন এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ নিশ্চিত করাও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা এবং আর্থিক সামর্থ্যের যথাযথ মূল্যায়ন।
একই সঙ্গে প্রয়োজন এমন একটি সমাজ ও অর্থনৈতিক পরিবেশ, যেখানে মানুষের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য থাকবে এবং সাধারণ আয়ের মানুষও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবেন।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (PBCCI) ও সম্পাদক, ইউরোবাংলা।
