![]()
নিউজ প্রোভাইডার
তারাখচিত আকাশের দিকে তাকালে যে নীলচে-কালো ক্যানভাস ভেসে ওঠে, তা যুগে যুগে মানুষকে আকর্ষিত করেছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় স্তর পেরিয়ে বিস্তৃত যে অসীম প্রান্তর, তাকেই বিজ্ঞানের পরিভাষায় মহাকাশ বলে। সাধারণ চোখে একে সম্পূর্ণ শূন্য বা নিথর স্থান মনে হলেও আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ভিন্ন তথ্য দেয়। মহাকাশ পরম শূন্যতা নয়, বরং তা প্লাজমা, আধানযুক্ত কণা, তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ এবং অদৃশ্য উপাদানের এক বিশাল মহাসমুদ্র।
মহাকাশের নির্দিষ্ট কোনো সূচনাবিন্দু নির্ধারণ করা বেশ কঠিন, কারণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল হুট করে শেষ না হয়ে উচ্চতার সঙ্গে ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে মিশে গেছে। তবে আন্তর্জাতিক অ্যারোনোটিক্যাল ফেডারেশনের স্বীকৃত নিয়ম অনুযায়ী সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০০ কিলোমিটার (প্রায় ৬২ মাইল) ওপরে অবস্থিত কাল্পনিক রেখাকে ‘কারমান রেখা’ বলা হয়। এই উচ্চতায় বাতাসের ঘনত্ব এতই কমে যায় যে সাধারণ বিমান উড়তে পারে না; ভাসমান থাকতে হলে মহাকাশযানকে রকেট ইঞ্জিন বা নির্দিষ্ট কক্ষপথীয় গতি ব্যবহার করতে হয়।
উপাদান ও রসায়নের বিচারে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একে ‘পারফেক্ট ব্যাকুয়াম’ বললেও সেখানে পদার্থের উপস্থিতি একদম শূন্য নয়। দৃশ্যমান উপাদানের প্রায় ৭৫ শতাংশ হাইড্রোজেন এবং ২৪ শতাংশ হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে গঠিত, যার সিংহভাগই আধানযুক্ত প্লাজমা অবস্থায় বিচরণ করে। এই গ্যাসীয় উপাদানের বাইরে রয়েছে ২০০ বিলিয়নেরও বেশি গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ, যার মধ্যে আমাদের নিবাস ‘মিল্কিওয়ে’। এ ছাড়া ছড়িয়ে রয়েছে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ, ধূমকেতু ও গ্রহাণু বেষ্টনী।
তবে মহাকাশের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো, টেলিস্কোপে দৃশ্যমান কোটি কোটি গ্যালাক্সি ও নক্ষত্র পুরো মহাবিশ্বের মোট ভরের মাত্র ৫ শতাংশ! বাকি ৯৫ শতাংশ উপাদানই মানুষের কাছে আজও অদৃশ্য। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে মহাবিশ্বের ২৭ শতাংশ জুড়েই রয়েছে ‘ডার্ক ম্যাটার’, যা আলো বিচ্ছুরিত না করলেও মহাকর্ষীয় টানে গ্যালাক্সিগুলোকে ধরে রাখে। অন্যদিকে প্রায় ৬৮ শতাংশ স্থান দখল করে আছে ‘ডার্ক এনার্জি’, যা এক বিকর্ষণমূলক শক্তি হিসেবে মহাবিশ্বকে ত্বরান্বিত গতিতে প্রসারিত করছে।
শব্দ প্রবাহ ও তাপমাত্রার দিক থেকেও মহাকাশ পৃথিবীর সম্পূর্ণ বিপরীত। শব্দ চলাচলের জন্য মাধ্যম প্রয়োজন হলেও মহাকাশে কণার ঘনত্ব অত্যন্ত নগণ্য হওয়ায় সেখানে কোনো শব্দ সঞ্চালিত হয় না; ফলে মহাজাগতিক বিস্ফোরণও ঘটে একদম পরম নীরবতায়। অন্যদিকে, সূর্যের আলো পাওয়া অংশে তাপমাত্রা ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলেও ছায়াযুক্ত অংশে তা নেমে যায় মাইনাস ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। ফাঁকা মহাকাশের গড় তাপমাত্রা সেলসিয়াস স্কেলে প্রায় মাইনাস ২৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (২.৭৩ কেলভিন), যা বিগ ব্যাংয়ের অবশিষ্টাংশ হিসেবে পরিচিত।
বিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া মানবজাতির মহাকাশ গবেষণা এখন এক নতুন যুগে পৌঁছেছে। হাবল ও জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো প্রযুক্তির সাহায্যে দূরবর্তী গ্যালাক্সি, কৃষ্ণগহ্বর ও এক্সোপ্ল্যানেটে প্রাণের সন্ধান চালানো হচ্ছে। এই অব্যাহত গবেষণার ফলে মহাকাশের অসীম অন্ধকার থেকে প্রতিদিন উন্মোচিত হচ্ছে সৃষ্টির অজানা নতুন সত্য।
