![]()
চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষণের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর জিপিএ ও ফলাফলে পরিবর্তন এসেছে। প্রকাশিত ফলে দেখা যায়, উত্তরপত্র চ্যালেঞ্জ করে ফেল থেকে নতুন করে পাস করেছেন ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩ হাজার ৭৯ জন। তবে এই পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফলেও যারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি, তাদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—খাতা কি দ্বিতীয়বার মূল্যায়নের জন্য পুনরায় আবেদন করা যাবে?
শিক্ষা বোর্ডের ঢাকা ও বরিশাল অঞ্চলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোর্ডের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রথমবার পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশের পর দ্বিতীয়বার একই উত্তরপত্র নিরীক্ষা বা মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই।
ঢাকার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানূ জানান, একটি ফলাফল প্রকাশের আগে মোট চারটি ধারাবাহিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। তাই বোর্ডের নির্ধারিত নীতিমালার বাইরে গিয়ে দ্বিতীয়বার আবেদন নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “বোর্ডের নীতিমালার বাইরে যাওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। এরপরও যদি কেউ সন্তুষ্ট না হন, তবে তাকে আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।”
একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা। তিনি জানান, আইনের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া শিক্ষা বোর্ডের কাছে আর কোনো বিকল্প খোলা থাকে না। তাঁর ভাষ্য, “কেউ যদি মনে করেন তিনি খাতার মূল্যায়নে সন্তুষ্ট নন এবং আদালতে রিট করেন, তবে আদালত নির্দেশ দিলে বোর্ড সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বাধ্য থাকবে।”
কেন দ্বিতীয়বার খাতা দেখার সুযোগ নেই?
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, একটি উত্তরপত্র চূড়ান্ত করার আগে ইতোমধ্যে চারটি ধাপ পার হয়: ১. প্রথম ধাপে সাধারণ পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন। ২. দ্বিতীয় ধাপে প্রধান পরীক্ষক তা পুনঃযাচাই করেন। ৩. তৃতীয় ধাপে নম্বর গণনায় কোনো ভুল আছে কি না, তা নিরীক্ষক যাচাই করেন। ৪. চতুর্থ ধাপে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হলে সম্পূর্ণ নতুন আরেকজন পরীক্ষক দিয়ে উত্তরপত্রটি পুনঃপরীক্ষা করা হয়।
ইতোমধ্যে এই চারটি ধাপ শেষ হওয়ায় বোর্ডের পক্ষে পুনরায় খাতা দেখার আইনগত ও প্রশাসনিক সুযোগ থাকে না।
রেকর্ড আবেদনের মুখোমুখি বোর্ড
চলতি বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। তবে মূল ফল প্রকাশের পর খাতা পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল রেকর্ড ৪ লাখ ২ হাজার ৫১টি। এর মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীও ছিলেন। একজন শিক্ষার্থী একাধিক বিষয়ে আবেদন করায় মোট লিখিত ও ব্যবহারিক মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষার আবেদন জমা হয়।
উত্তরপত্র মূল্যায়নে আবেদনের এই অস্বাভাবিক সংখ্যা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনও বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বিদ্যমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যতে উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “যেখানে ১২ লাখের বেশি আবেদন জমা হয়েছে, তা রিচেক করে কলেজে ভর্তি নিশ্চিত করা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ভবিষ্যতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে যেসব খাতায় গুরুতর সমস্যা রয়েছে, কেবল সেগুলোর মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হবে।” পাশাপাশি পরীক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং ওভার মার্কিং বা আন্ডার মার্কিং বন্ধে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও আইনি পদক্ষেপের বিষয়টিও নীতিমালায় যুক্ত করার কথা জানান তিনি।
তবে শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, শুধু নীতিমালা তৈরি করে খাতা পুনঃনিরীক্ষণের চাপ সামলানো সাময়িক সমাধান হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. আব্দুস সালামের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রথাগত তাত্ত্বিক পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন না হলে শিক্ষার্থীদের যথার্থ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
