![]()
ভুল করে জ্যামিতিক চতুর্থ মাত্রায় (4D) ঢুকে পড়লে আপনার সাথে কী ঘটবে?
কেমন হতো যদি আপনি এমন এক অদ্ভুত জগতে হারিয়ে যান যেখানে কোনো দেয়াল আপনাকে আটকে রাখতে পারবে না, কিংবা ঘরের দরজা না খুলেই আপনি ঘরের বাইরে চলে যেতে পারবেন? শুনতে কোনো সায়েন্স ফিকশন বা কল্পকাহিনীর সিনেমার গল্প মনে হলেও, পদার্থবিদ্যা ও জ্যামিতির তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা যদি আমাদের এই চেনা ত্রিমাত্রিক (3D) জগৎ ছেড়ে কোনোভাবে জ্যামিতিক চতুর্থ মাত্রায় (4D) ঢুকে পড়ি, তবে আমাদের সাথে ঠিক এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনাময় কাণ্ডই ঘটবে!
- 👻 দেয়াল ভেদ: দরজা-জানালা না খুলেই চারদিক থেকে বন্ধ লকার বা ঘর থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা।
- 👁️ অবিশ্বাস্য দৃষ্টিশক্তি: যেকোনো বস্তুর সামনে, পেছনে, ওপর, নিচ এবং তার ঠিক ভেতরের অংশ এক পলকেই দেখা।
- 🫀 অভ্যন্তরীণ স্পর্শ: চামড়া বা বাইরের আবরণ না কেটেই শরীরের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সরাসরি ছুঁয়ে দেওয়া।
- 🌫️ অন্তর্ধান (Teleportation): 3D জগতের মানুষের চোখে আপনি হঠাৎ হাওয়া থেকে উদয় হবেন এবং পরক্ষণেই মিলিয়ে যাবেন!
দ্বিমাত্রিক (2D) জগতের উদাহরণ ও শরীরের ভেতরের দৃশ্য
একটি কাগজের ওপর কলম দিয়ে একটি মানুষের ছবি আঁকুন এবং তার চারপাশে একটি গোল বৃত্ত টেনে তাকে আটকে দিন। ওই কাগজের দ্বিমাত্রিক (2D) মানুষটি যেহেতু কেবল কাগজের লাইনের ভেতরেই চলাফেরা করতে পারে, তাই বৃত্তের দেয়াল ডিঙিয়ে বা ভেদ করে তার পক্ষে বাইরে বের হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আপনি ত্রিমাত্রিক (3D) জীব হওয়ায় ওপর থেকে কাগজের দিকে হাত বাড়িয়ে ওই 2D মানুষের শরীরের ভেতরের অংশ বা বৃত্তের ভেতরের যেকোনো কিছু সরাসরি ছুঁয়ে দিতে পারেন। এর জন্য আপনাকে কিন্তু বৃত্তের ওই কাগজের দেয়ালটি কাটতে বা ভাঙতে হয়নি। ওপরের খোলা দিকটিই আপনার জন্য রাস্তা।
একইভাবে আপনি যখন চতুর্থ মাত্রায় (4D) থাকবেন, আপনার হৃৎপিণ্ড বা ফুসফুস আপনার শরীরের ভেতরেই থাকবে। কিন্তু 3D জগতে যা চামড়া দিয়ে ঢাকা বা “ভেতরে” ছিল, 4D মাত্রার কোণ থেকে সেটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত মনে হবে। অর্থাৎ, কোনো 4D জীব আপনার শরীরের ভেতর হাত ঢোকাতে চাইলে তাকে আপনার চামড়া কাটতে হবে না, সে সরাসরি আপনার হৃৎপিণ্ড ছুঁয়ে দিতে পারবে।
দরজা না খুলেই বন্ধ ঘর থেকে বের হওয়া!
আপনি যখন একটি চার দেয়াল এবং ছাদযুক্ত শক্ত ঘরের ভেতরে দরজা-জানলা বন্ধ করে বসে থাকেন, তখন এই 3D জগতের বাইরে থেকে কেউ আপনাকে দেখতে বা স্পর্শ করতে পারে না। কিন্তু কাগজের ওই 2D মানুষের কথা আবার ভাবুন; তার কাছে ওপরের দিকটি ছিল সম্পূর্ণ অদৃশ্য। চতুর্থ মাত্রা হলো এমন একটি সম্পূর্ণ নতুন দিক, যা আমাদের 3D ঘরের দেয়াল, মেঝে বা ছাদ কোনো কিছু দিয়েই আটকানো নয়। ফলে, আপনি চারদিক থেকে বন্ধ কোনো ব্যাংকের লকার বা নিরেট ইস্পাতের ঘরের ভেতরে থাকলেও, চতুর্থ দিক থেকে সেই ঘরের কোনো ছাদ বা দেয়ালই থাকবে না! কোনো দরজা না খুলেই আপনাকে সেই ঘর থেকে আলতো করে বাইরে বের করে আনা সম্ভব হবে।
একনজরে: বিভিন্ন মাত্রার মধ্যে তুলনামূলক সীমাবদ্ধতা
| মাত্রা (Dimension) | উদাহরণ | চলাচলের সীমাবদ্ধতা | দৃষ্টির ক্ষমতা |
|---|---|---|---|
| 2D (দ্বিমাত্রিক) | কাগজে আঁকা ছবি | কাগজের লাইনের ভেতরেই আটকে থাকে | শুধু সামনের অংশ (লাইন হিসেবে) দেখে |
| 3D (ত্রিমাত্রিক) | আমাদের বর্তমান বিশ্ব | দেয়াল বা ছাদের ভেতরে বন্দি থাকে | সামনে, ওপরে ও দুই পাশ (ভেতরটা নয়) |
| 4D (চতুর্থ মাত্রা) | হাইপারস্পেস | কোনো 3D বস্তু বা দেয়াল আটকাতে পারে না | বস্তুর ভেতর-বাহির, সব দিক একইসাথে দেখে |
এক পলকেই বস্তুর ভেতর-বাহির দেখার অলৌকিক ক্ষমতা
আমাদের এই চেনা জগতে আপনার সামনে যদি একটি নিরেট কাঠের বক্স বা একটি আপেল রাখা হয়, আপনি এক নজরে সর্বোচ্চ তার সামনে, ওপরে এবং দুই পাশ দেখতে পাবেন। এর পেছনের অংশ বা একদম ভেতরের অংশ দেখতে হলে আপনাকে বস্তুটি ঘোরাতে হবে অথবা কেটে দেখতে হবে। যদি আপনার চোখ এবং মস্তিষ্কের দেখার ক্ষমতাকে অলৌকিকভাবে চতুর্থ মাত্রার (4D) উপযোগী করে দেওয়া হতো, তবে আপনার চোখের সামনে একটি অবিশ্বাস্য দৃশ্য ভেসে উঠত। আপনি যেকোনো বস্তুর সামনে, পেছনে, ডানে, বামে, ওপর, নিচ এবং তার ঠিক ভেতরের অংশও একই সাথে এক পলকেই দেখতে পেতেন! যদিও আমাদের বর্তমান ত্রিমাত্রিক মস্তিষ্ক এই অতিরিক্ত মাত্রার ভিজ্যুয়াল ডেটা প্রসেস করতে না পেরে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে।
ভূত নাকি বিজ্ঞান? ত্রিমাত্রিক জগতে আপনার ছায়া
একটি ত্রিমাত্রিক গোলক বা বল যদি একটি 2D কাগজের জগৎকে ভেদ করে ওপর থেকে নিচে নেমে যায়, তবে সেই কাগজের জগতের মানুষেরা পুরো বলটিকে একসাথে দেখতে পাবে না। বলটি যখন কাগজকে স্পর্শ করবে, তারা প্রথমে দেখবে বাতাস থেকে হঠাৎ একটি ছোট বিন্দু উদয় হলো, বলটি যত নামবে বিন্দুটি বড় বৃত্ত হবে, আর বলটি কাগজ পার হয়ে গেলে বৃত্তটি আবার ছোট হয়ে হঠাৎ হাওয়া হয়ে যাবে।
আপনি যদি 4D জগত থেকে আবার আমাদের এই 3D জগতে প্রবেশ করেন, তবে আমাদের কাছে আপনাকে একটি অলৌকিক ভূতের মতো মনে হবে। কারণ আপনি যখন 4D মাত্রার দিক থেকে আমাদের জগতে নড়াচড়া করবেন, আমাদের 3D চোখ কেবল আপনার 4D শরীরের একটি ত্রিমাত্রিক ‘ছায়া’ দেখতে পাবে। আমাদের চোখে মনে হবে আপনি হঠাৎ শূন্য থেকে বাতাসে ভেসে উঠলেন, আবার পরক্ষণেই দেয়ালের ভেতর দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন!
ফ্ল্যাটল্যান্ড এবং জ্যামিতিক বাস্তবতার বন্দিশালা
চতুর্থ মাত্রা বা হাইপারস্পেস হলো এমন এক জ্যামিতিক বাস্তবতার নাম, যা আমাদের চেনা জগতের সমস্ত সীমানা এবং পদার্থবিদ্যার নিয়মকে ওলটপালট করে দেয়। আমাদের শরীর এবং মস্তিষ্ক ত্রিমাত্রিক উপাদানে তৈরি বলেই আমরা এই 3D মাত্রার বন্দিশালায় আটকে আছি। তবে কল্পনার চোখ দিয়ে যদি আমরা একবার সেই জ্যামিতিক চতুর্থ মাত্রায় হারিয়ে যেতে পারতাম, তবে পুরো মহাবিশ্ব আমাদের কাছে এক নতুন বিস্ময় হিসেবে ধরা দিত! এ বিষয়ে আরও গভীরে জানতে এডউইন এ. অ্যাবটের (Edwin A. Abbott) লেখা বিখ্যাত বই ‘Flatland: A Romance of Many Dimensions’ পড়ে দেখতে পারেন।
