![]()
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কেবল ব্যক্তিগত সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বৈশ্বিক এক সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব কেবল মানসিক কষ্টে সীমাবদ্ধ থাকে না, মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন দিনের বড় একটি অংশ চরম একাকিত্বে ভোগেন। বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে এখন ‘একাকিত্বের মহামারি’ বলে অভিহিত করছেন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. অ্যাঞ্জেলা ডাকওয়ার্থ এবং আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ماہرদের মতে, একাকিত্ব দূর করতে কার্যকর হতে পারে নিচের তিনটি পদক্ষেপ:
১. প্রযুক্তি নির্ভরতা কমানো ও সশরীরে যোগাযোগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কল বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট মানুষের যোগাযোগ সহজ করলেও এগুলো বাস্তব যোগাযোগের বিকল্প হতে পারে না।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) অধ্যাপক ড. শেরি টার্কল জানান, প্রযুক্তি কোনো ধরনের ঝুঁকি বা আবেগীয় আত্মপ্রকাশ ছাড়াই সম্পর্কের এক ধরনের মিথ্যা অনুভূতি তৈরি করে। তবে প্রকৃত বন্ধুত্বের জন্য নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা এবং সরাসরি মানুষের মুখোমুখি হওয়া জরুরি। এআই চ্যাটবট বা ভিডিও কলের চেয়ে মানুষের শারীরিক উপস্থিতি ও বাস্তব সামাজিক সম্পৃক্ততা একাকিত্ব কমাতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।
২. প্রতিদিন ছোট ছোট সামাজিক চর্চা করা
হুট করে গভীর বন্ধুত্ব তৈরি করা সম্ভব নয়। তবে দৈনন্দিন ছোট ছোট যোগাযোগের মাধ্যমে ‘সামাজিক পেশি’ শক্ত করা যায়।
-
কফি শপের কর্মী বা রেস্তোরাঁর ওয়েটারকে ধন্যবাদ জানানো বা অভিবাদন দেওয়া।
-
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পাশের মানুষের সাথে দু-একটি কথা বলা।
-
কোনো শখের ক্লাব, ওয়ার্কশপ, সামাজিক সংগঠন বা সকালে হাঁটাহাঁটির দলে যোগ দেওয়া।
মনোবিজ্ঞানী ড. লিন বুফকার মতে, এসব ছোট মুহূর্তগুলো হয়তো সরাসরি গভীর বন্ধুত্ব তৈরি করবে না, তবে একজন মানুষকে সামাজিক পরিবেশের অংশ হিসেবে অনুভব করতে সাহায্য করবে। নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে নতুন বন্ধু তৈরির পুরনো অভ্যাস আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
৩. সাহসী ও কৌতূহলী মনোভাব গড়ে তোলা
অপরিচিত মানুষের সাথে কথা বলতে অস্বস্তি বা প্রত্যাখ্যানের ভয় কাজ করা স্বাভাবিক। তবে বিশেষজ্ঞরা এটিকে কোনো পরীক্ষা বা ব্যর্থতার ভয় হিসেবে না দেখে সহজ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার পরামর্শ দেন।
কারো সাথে মতের অমিল থাকলেও তার দৃষ্টিকোণ জানার চেষ্টা করা যেতে পারে। যেমন—কোনো একটি বিষয় বা সিনেমা আপনার অপছন্দ হলেও অন্যজন কেন তা পছন্দ করছেন, তা কৌতূহল নিয়ে জানার চেষ্টা করা। শুরুতেই গভীর বা ব্যক্তিগত আলোচনা না করে সাধারণ কথাবার্তা দিয়ে যোগাযোগ শুরু করলে ধীরে ধীরে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
সংক্ষেপে বার্তা:
একাকিত্ব কোনো স্থায়ী অবস্থা নয়। প্রযুক্তির ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে বাস্তব জীবনের মানুষদের প্রতি কিছুটা সময় ও মনোযোগ দিলেই এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
সূত্র: সিএনএন
