Touch Bangladesh
ঢাকাশনিবার , ২৯ আগস্ট ২০২৬
  1. অর্থ-বাণিজ্যের সমাধানের খোঁজে
  2. উন্নয়নের ছোঁয়ায় বিজ্ঞান তথ্য ও প্রযুক্তি
  3. খেলাধুলার আনন্দ
  4. ছবি কথা বলে
  5. টাচ বাংলাদেশ সংবাদ
  6. ধর্মের স্বাধীনতার আওয়াজ
  7. নতুন কর্মের খোঁজে
  8. নিত্যদিনের জীবন
  9. বিশেষ সংবাদ সমূহ
  10. রাষ্ট্রের কল্যাণে সম্পাদকীয়
  11. রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন
  12. রেমিট্যান্সযোদ্ধার চেতনা
  13. শিক্ষার আলোর প্রস্তাব
  14. শিল্প-সাহিত্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও বিনোদনের ঠিকানা
  15. সাম্প্রতিক বিশ্ব
আলোচিত সপ্তাহের খবর

অমর একুশে বইমেলায় আসছে জেমস রানার উপন্যাস ‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’

প্রতিবেদক
Louis Daru
আগস্ট ২৯, ২০২৬ ২:৫৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

Loading

শিক্ষকতার নীরব আত্মত্যাগের মহাকাব্য:

অমর একুশে বইমেলায় আসছে জেমস আব্দুর রহিম রানার উপন্যাস ‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’

সাহিত্য প্রতিবেদক

প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলায় অসংখ্য নতুন বই প্রকাশিত হয়। কিছু বই পাঠককে বিনোদন দেয়, কিছু বই চিন্তার খোরাক জোগায়, আবার কিছু বই মানুষের ভেতরের সুপ্ত মানবিকতাকে জাগিয়ে তোলে। প্রখ্যাত লেখক, সাংবাদিক ও সাহিত্যগবেষক জেমস আব্দুর রহিম রানা-এর নতুন সামাজিক-মানবিক উপন্যাস ‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’ সেই তৃতীয় ধারার একটি সম্ভাবনাময় সংযোজন, যা পাঠককে শুধু একটি গল্প পড়তে নয়, বরং একজন শিক্ষকের অদৃশ্য জীবনসংগ্রামকে নতুন করে উপলব্ধি করতে আহ্বান জানায়।

আসন্ন অমর একুশে বইমেলায় আলোর দিশারী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিতব্য এ উপন্যাসটি ইতোমধ্যে এর বিষয়বস্তু, প্রচ্ছদ এবং মানবিক বার্তার কারণে সাহিত্যপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রে স্থান করে নিয়েছে।
বাংলাদেশের সাহিত্যভুবনে শিক্ষককে কেন্দ্র করে বহু গল্প লেখা হয়েছে, কিন্তু শিক্ষকতার নীরব আত্মত্যাগ, শিক্ষার্থীর প্রতি দায়বদ্ধতা, সামাজিক সম্প্রীতি, নারী সংগ্রাম এবং মানুষ গড়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রচিত পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস তুলনামূলকভাবে বিরল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’ কেবল একটি উপন্যাস নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক দলিল, যেখানে একজন শিক্ষকের জীবনকে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
উপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছেন রেহানা পারভীন সুপ্তা—একজন নারী শিক্ষক, যিনি ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙন, আর্থিক সংকট, সামাজিক কটূক্তি এবং পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রাম চালিয়ে যান। তাঁর চরিত্রে লেখক কেবল একজন শিক্ষককে আঁকেননি; বরং বাংলাদেশের হাজারো নীরব শিক্ষকের প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করেছেন।
উপন্যাসের সূচনায় লখাইডাঙ্গা গ্রামের যে চিত্র উঠে আসে, তা পাঠককে গ্রামীণ বাংলাদেশের পরিচিত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। বাঁশবাগান, বিদ্যালয়ের ঘণ্টা, কৃষ্ণচূড়া গাছ, সরস্বতী পূজা, ঈদের মিষ্টি বিনিময়—সবকিছু মিলে এক মানবিক সহাবস্থানের সমাজচিত্র নির্মিত হয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রীতির এই উপস্থাপন কাহিনিকে শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্য দেয়নি, সমকালীন সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তাও বহন করেছে।
উপন্যাসের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী অংশ রাকিব নামের এক দরিদ্র শিক্ষার্থীর গল্প। অর্থাভাবে যখন তার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম, তখন রেহানা পারভীন সুপ্তা এবং তাঁর সহকর্মীরা এগিয়ে আসেন। এখানে লেখক একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন—একজন শিক্ষক কি শুধু পাঠ্যবই পড়িয়ে তাঁর দায়িত্ব শেষ করতে পারেন? নাকি শিক্ষার্থীর জীবনসংগ্রামের সঙ্গেও তাঁর নৈতিক সম্পর্ক রয়েছে?
এই প্রশ্নই উপন্যাসটিকে সাধারণ শিক্ষাকেন্দ্রিক গল্প থেকে আলাদা করেছে।
বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীর আত্মমর্যাদা ও সংগ্রাম। রেহানা পারভীন সুপ্তা কোনো কাল্পনিক সুপারহিরো নন। তিনি ভেঙে পড়েন, কাঁদেন, দুশ্চিন্তা করেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। তাঁর এই মানবিক দুর্বলতা এবং দৃঢ়তার সমন্বয় চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য ও জীবন্ত করে তুলেছে।
সাহিত্য সমালোচনার দৃষ্টিতে উপন্যাসটির ভাষা সহজ, সাবলীল এবং আবেগনির্ভর। লেখক সচেতনভাবেই জটিল সাহিত্যিক কারুকাজের পরিবর্তে পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছাতে সক্ষম এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন। ফলে বইটি কেবল সাহিত্যবোদ্ধাদের জন্য নয়, সাধারণ পাঠকের কাছেও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
তবে সমালোচনামূলক আলোচনায় বলা যায়, উপন্যাসটির কয়েকটি চরিত্র বাস্তবতার তুলনায় কিছুটা আদর্শবাদী। সমাজের নেতিবাচক শক্তি, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট আরও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপিত হলে কাহিনির সংঘাত আরও তীব্র হতে পারত। কিন্তু লেখকের লক্ষ্য যেহেতু মানবিক আলোকবর্তিকা তুলে ধরা, তাই তিনি সচেতনভাবেই আশাবাদী বয়ানকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
বইটির প্রচ্ছদও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রচ্ছদের কেন্দ্রে একজন শিক্ষিকার দৃঢ় অথচ মমতাময় মুখাবয়ব, পেছনে বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের সারি এবং পাশে ঝুলন্ত বিদ্যালয়ের ঘণ্টা—এই তিনটি উপাদান পুরো উপন্যাসের দর্শনকে এক ফ্রেমে ধারণ করেছে। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত সোনালি-আলোকিত আবহ শিক্ষার আলো ও আশার প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে। প্রচ্ছদশিল্পী দৃশ্যত দেখাতে চেয়েছেন—একজন শিক্ষক সামনে থাকেন, কিন্তু তাঁর আলোকিত পথ ধরে এগিয়ে যায় একটি প্রজন্ম। একটি শক্তিশালী বইয়ের প্রচ্ছদ পাঠকের প্রথম আকর্ষণ তৈরি করে, আর ‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’র প্রচ্ছদ সেই কাজটি সফলভাবেই করেছে।
বইয়ের শেষ প্রচ্ছদেও রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থাপনা। লেখক পরিচিতি, বইয়ের সারবস্তু এবং একটি স্মরণীয় উক্তি—“একজন শিক্ষক হয়তো একটি শ্রেণিকক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করেন; কিন্তু তাঁর শেখানো একটি মূল্যবোধ কখনো কখনো প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের জীবনকে আলোকিত করে”—পুরো বইয়ের মূল দর্শনকে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরেছে।
গ্রন্থটির উৎসর্গপত্রও পাঠকের আবেগ স্পর্শ করতে সক্ষম। লেখকের প্রয়াত পিতা মরহুম দাউদ আলী বিশ্বাসের স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গিত এ বইয়ে লেখক তাঁর পিতার সততা, মানবিকতা ও শিক্ষাপ্রেমকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন। বিশেষ করে খাকুন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিচারণ উৎসর্গপত্রকে একটি ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মাত্রা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে ‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’ এমন এক সময়ে প্রকাশিত হচ্ছে, যখন সমাজে শিক্ষকতার মর্যাদা, শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন। উপন্যাসটি মনে করিয়ে দেয়—একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখেন, ভেঙে পড়া মানুষকে দাঁড়াতে শেখান এবং অদৃশ্যভাবে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।
হাজারো নতুন বইয়ের ভিড়ে যদি কোনো পাঠক এমন একটি বই খুঁজে থাকেন, যা পড়ে তিনি তাঁর জীবনের কোনো এক প্রিয় শিক্ষককে স্মরণ করবেন, মানবিকতার শক্তিতে নতুন করে বিশ্বাস করবেন এবং শিক্ষা সম্পর্কে ভিন্নভাবে ভাবতে শিখবেন—তবে ‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’ হতে পারে সেই বই।
কারণ বিদ্যালয়ের ঘণ্টা একদিন থেমে যায়, কিন্তু একজন প্রকৃত শিক্ষকের শিক্ষা ও আদর্শের প্রতিধ্বনি কখনো থামে না। সেই অনন্ত প্রতিধ্বনির নামই—**‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’।**

error: লেখাগুলো টাচ বাংলাদেশ - স্পর্শে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।