![]()
প্রতিদিন ভোর সাড়ে পাঁচটা। মেঘনা নদীতে তখন জাল ফেলছেন জেলেরা, আর তিন সেতুর ওপর দিয়ে ঝিকঝিক শব্দে ছুটে চলেছে ট্রেন ও দূরপাল্লার যানবাহন। ঠিক এই কুয়াশাচ্ছন্ন বা স্নিগ্ধ আলোয় কিশোরগঞ্জের ভৈরব প্রান্তে মেঘনা নদীর পাড়ে নামতে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষের স্রোত।
কাউকে দেখা যায় দৌড়াতে, কেউ হাঁটছেন, আবার কোনো দল ব্যস্ত যোগব্যায়ামে। নদীর তীরে ফুটবল খেলায় মেতে উঠেছে ছোট ছোট শিশুরা। গত দেড় দশক ধরে ভৈরবের মেঘনা তীরের এই চিত্র যেন প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, কোনো আনুষ্ঠানিক কমিটি বা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছাড়াই কেবল একটি মন্ত্রকে সামনে রেখে এখানে চারটিরও বেশি বড় দল নিয়মিত শরীরচর্চা করে—‘সূর্যের আগে উঠতে হবে’।
নিয়মিত হাঁটা থেকে ম্যারাথনের পথ
‘ম্যারাথন দৌড় গ্রুপ’ নামের একটি দলের উদ্যোক্তা ও কাকলি খেলাঘর আসর ভৈরব শাখার সভাপতি মফিজুল ইসলাম জানান, আগে রাত জেগে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস ছিল তাঁদের। শরীর ও মনকে চাঙ্গা রাখতে কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নেন সূর্য ওঠার আগেই দিন শুরু করার।
প্রথমে হাঁটা দিয়ে শুরু হলেও এই দলের সদস্যরা এখন ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নিচ্ছেন। দলে আছেন শিক্ষক, ব্যাংকার, চিকিৎসক ও মসজিদের ইমাম। প্রায় ৫০ সদস্যের এই দলে রয়েছে কঠোর শৃঙ্খলা—টানা তিন দিন বিনা নোটিশে অনুপস্থিত থাকলে দিতে হয় জবাবদিহি। নিয়মিত প্রাতর্ভ্রমণে ওজন নিয়ন্ত্রণসহ মানসিকভাবেও নিজেদের সুস্থ দাবি করছেন অংশগ্রহণকারীরা।
‘এভারগ্রিন চত্বর’ ও হাসির ব্যায়াম
নদীর পাড়ে দুটি সেতুর মাঝখানে গড়ে ওঠা ‘এভারগ্রিন চত্বর’ প্রাতর্ভ্রমণকারীদের আরেকটি বড় আস্তানা। এখানে প্রতিদিন প্রায় ৫০ জন সদস্য নিয়মিত শারীরিক কসরতের পাশাপাশি ইয়োগা বা যোগব্যায়াম করেন।
শরীরচর্চা শেষে এই দলের সদস্যরা নিয়ম করে দলবদ্ধভাবে উচ্চ স্বরে হাসেন—যার লক্ষ্য মন ও শরীরকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখা। ব্যায়াম শেষে নদীর হাওয়ায় চলে শহরের পরিচ্ছন্নতা, সমাজ ও পরিবেশচিন্তা নিয়ে খোলামেলা আড্ডা। প্রতি শুক্রবার আবার আয়োজন করা হয় ভুনাখিচুড়ির।
স্বাস্থ্যচর্চার সাথে সবুজায়ন
কেবল নিজের শরীরের যত্ন নিয়েই ক্ষান্ত নন ভৈরবের এসব ভোরের মানুষ। প্রাতর্ভ্রমণের পাশাপাশি মেঘনার পাড় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন তাঁরা। নিয়মিত আগাছা পরিষ্কারের পাশাপাশি নদীর পাড়ে রোপণ করা হয়েছে অসংখ্য কৃষ্ণচূড়া ও ছায়াদার বটবৃক্ষ, যা এখন ডালপালা মেলে পথিককে ছায়া দিচ্ছে।
দীর্ঘ দুই দশক ধরে নদীর পাড়ে নিয়মিত প্রাতর্ভ্রমণ করছেন ভৈরব সরকারি হাজি আসমত কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান। তাঁর মতে, সুস্থ থাকার জন্য শরীরচর্চার পাশাপাশি মনকে সতেজ রাখাও জরুরি। সেই তাগিদ থেকেই প্রাতর্ভ্রমণকারীদের নিয়ে তাঁরা গড়ে তুলেছেন ভ্রমণকেন্দ্রিক ‘ট্যুরিস্ট ক্লাব’।
মেঘনার পাড় এখন আর কেবল শারীরিক ব্যায়ামের জায়গা নয়; বরং স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য তা হয়ে উঠেছে পারস্পরিক সামাজিক বন্ধন, পরিবেশ চেতনা ও বন্ধুত্বের এক অনন্য মিলনমেলা।
