![]()
গাজীপুরের জয়দেবপুর এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশের নিঝুম জলাশয়ে ভেসে উঠেছিল একটি স্যুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তা। ১১ সেপ্টেম্বরের সেই কালচে পানিতে ভেসে ওঠা বস্তা খুলতেই বেরিয়ে আসে এক নারীর খণ্ডিত ও অর্ধগলিত লাশ। আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই ঘটনার নেপথ্যে উন্মোচিত হয়েছে ৫ বছরের এক অন্ধ প্রেমের নির্মম ও হাড়হিম করা রূপকথা, যেখানে বিয়ের চাওয়া আর ক্ষোভের জের ধরে প্রেমিকা ডলি আক্তারকে (৩০) পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে দেহ কেটে দ্বিখণ্ডিত করা হয়।
- 💔 বিশ্বাসঘাতক প্রেম: স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর গার্মেন্টসকর্মী মিশন ইসলামকে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলেন ডলি। তবে বিয়ের চাপে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি।
- 💊 পরিকল্পিত হত্যা: ৮ সেপ্টেম্বর রাতে খাবারের সাথে কড়া ঘুমের ওষুধ খাইয়ে নিস্তেজ করা হয় ডলিকে; রাত ২টায় গলায় লুঙ্গি পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধে খুন করে মিশন।
- 🪓 বটি দিয়ে দেহ দ্বিখণ্ডিতকরণ: সকালে ছেলের অপরাধ জেনেও পুলিশে না গিয়ে লাশ গুম করতে সাহায্য করেন মা বানু আক্তার; স্যুটকেসে না ধরায় বটি ও ব্লেড দিয়ে ডলির কোমর থেকে শরীর দ্বিখণ্ডিত করা হয়।
- 🩸 বন্ধুর হাতে রক্ত ও সত্য প্রকাশ: বাসা বদলের বাহানায় অটোরিকশায় ভারী ব্যাগ তোলার পর ব্রিজের পানিতে ফেলার সময় রক্ত লেগে সত্য জানতে পারে বন্ধু মিল্টন।
- ⚖️ ২৪ ঘণ্টায় পিবিআইয়ের সাফল্য: মামলা দায়েরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পিবিআই প্রেমিক মিশন, তার মা বানু আক্তার ও বন্ধু মিল্টনকে গ্রেফতার করে; আদালতে ৩ জনই ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
মিষ্টি কথায় ঘুমের ওষুধ ও গভীর রাতের নৃশংসতা
স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর পাঁচ বছর ধরে গার্মেন্টসকর্মী মিশনের সাথেই ছিল ডলির প্রেমের সম্পর্ক। ডলি বারবার বিয়ের জন্য চাপ দিলে মিশন তাকে সরিয়ে দেওয়ার ব্লু-প্রিন্ট আঁকে। ৮ সেপ্টেম্বর রাতে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে ডলিকে নিজের বাড়িতে ডেকে আনে মিশন। মা বানু আক্তার ও ডলির সাথে এক টেবিলে রাতের খাবার খাওয়ার সময় কৌশলে ডলিকে কড়া ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেওয়া হয়। রাত ২টার দিকে ডলি যখন অসাড় হয়ে পড়ে, তখন মিশন তার গলায় লুঙ্গি পেঁচিয়ে ও মুখে বালিশ চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা নিশ্চিত করে এবং লাশ কাঠের চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখে।
ছেলের অপরাধ ঢাকতে মায়ের সহায়তা ও লাশ দ্বিখণ্ডিতকরণ
পরদিন সকালে ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে মা বানু আক্তার চৌকির নিচে ডলির নিথর দেহ দেখতে পান। আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে তিনি ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন। বাজার থেকে কেনা হয় একটি স্যুটকেস। কিন্তু পুরো লাশ ভেতরে না ধরায় বটি দা ও ব্লেড চালিয়ে ডলির দেহ কোমর থেকে কেটে দুই টুকরো করে ঘাতক মিশন। এক অংশ ঢোকানো হয় স্যুটকেসে, আর বাকি অংশ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরা হয়।
ব্রিজের পানিতে লাশ গুম ও পিবিআইয়ের সফল অভিযান
বাসা বদলানোর বাহানা দিয়ে বন্ধু মিল্টনকে ডেকে আনে মিশন। অজ্ঞাতেই মিল্টন অটোরিকশায় সেই ভারী স্যুটকেস ও বস্তা তোলে। পরবর্তীতে ভবানীপুর ব্রিজ থেকে সেগুলো পানিতে ফেলার সময় মিল্টনের হাতে তাজা রক্ত লাগলে আসল ঘটনা স্বীকার করে মিশন। ঘটনার পর পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মোঃ রকিবুল আক্তার ও তদন্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান আনসারীর চৌকস টিম প্রযুক্তির সহায়তায় রহস্য উন্মোচন করে। ডলির ভাই সোহেলের মামলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মিশন, তার মা বানু আক্তার ও বন্ধু মিল্টনকে গ্রেফতার করা হয় এবং উদ্ধার করা হয় রক্তমাখা বটি দা, স্কচটেপ, এনআইডি কার্ড ও মোবাইল ফোন।
মামলা ও ঘটনার তথ্যচিত্র
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| নিহত ব্যক্তি | ডলি আক্তার (৩০) |
| প্রধান অভিযুক্ত (ঘাতক) | মিশন ইসলাম (গার্মেন্টসকর্মী, প্রেমিক) |
| অন্যান্য গ্রেফতারকৃত অভিযুক্ত | বানু আক্তার (মিশনের মা) ও মিল্টন (মিশনের বন্ধু) |
| ঘটনাস্থল ও লাশ উদ্ধারের স্থান | জয়দেবপুর ও ভবানীপুর ব্রিজ সংলগ্ন জলাশয়, গাজীপুর |
| তদন্তকারী সংস্থা ও কর্মকর্তা | পিবিআই গাজীপুর (এসপি মোঃ রকিবুল আক্তার ও মোস্তাফিজুর রহমান আনসারী) |
| উদ্ধারকৃত আলামত | রক্তমাখা বটি দা, স্কচটেপ, ডলির এনআইডি কার্ড, ব্যবহৃত জুতো ও মোবাইল ফোন |
