![]()
পেটের ভুঁড়ি শুধু সৌন্দর্য বা ওজনের বিষয় নয়, এটি পুরুষের হরমোনের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষের টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে বয়সের চেয়ে পেটের গভীরে জমে থাকা চর্বির সম্পর্ক আরও বেশি স্পষ্ট হতে পারে।
টেস্টোস্টেরন পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্য, পেশির গঠন, হাড়ের শক্তি এবং যৌন আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। বয়স বাড়ার সঙ্গে এর মাত্রা কমতে পারে। তবে সাম্প্রতিক এই বিশ্লেষণ বলছে, হরমোনের মাত্রা পরিবর্তনের পেছনে শরীরে চর্বি জমার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জার্নাল অব দ্য এন্ডোক্রাইন সোসাইটিতে প্রকাশিত বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী প্রায় পাঁচ হাজার পুরুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে পেটের ভেতরে বিভিন্ন অঙ্গের চারপাশে জমে থাকা চর্বির সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
পেটের গভীরে জমা চর্বি কেন উদ্বেগের?
পেটের ভেতরে লিভার, পাকস্থলী ও অন্ত্রের মতো অঙ্গের চারপাশে যে চর্বি জমে, তাকে বলা হয় ভিসেরাল ফ্যাট বা অন্তঃপেটীয় চর্বি। ত্বকের ঠিক নিচে জমা চর্বির তুলনায় এই চর্বি শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম ও হরমোনের ভারসাম্যে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরুষদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রার সঙ্গে ভিসেরাল ফ্যাটের সম্পর্ক বেশ জোরালো। বিশেষ করে ২০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে বয়সের সঙ্গে হরমোনের মাত্রার সম্পর্কের তুলনায় পেটের গভীরে জমে থাকা চর্বির সম্পর্ক বেশি স্পষ্ট ছিল।
বিশ্লেষণটির লেখক কার্ল ফ্রিডল ও অ্যাডাম পটার মনে করেন, পুরুষের টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার বিষয়টি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভিসেরাল ফ্যাটকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আগের গবেষণাতেও মিলেছে একই ইঙ্গিত
শরীরের অতিরিক্ত চর্বি ও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার সম্পর্ক নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে।
২০০৭ সালে ১ হাজার ৬৬৭ জন পুরুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) চার থেকে পাঁচ পয়েন্ট বাড়ার সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমার সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণাটিতে এই পরিবর্তনের প্রভাবকে প্রায় ১০ বছর বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রভাবের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল।
২০১৩ সালের আরেকটি গবেষণায় ১ হাজার ৩৮২ জন পুরুষকে পাঁচ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমার সঙ্গে বয়সের পাশাপাশি ধূমপান, স্থূলতা, বিষণ্নতা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পাওয়া যায়।
এসব গবেষণা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, বয়স বাড়লেই টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমবে—বিষয়টি এতটা সরল নয়। জীবনযাপন, বিপাকীয় স্বাস্থ্য ও শরীরে চর্বির পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
শুধু ওজন বা কোমরের মাপ কি যথেষ্ট?
শরীরের ওজন, বিএমআই ও কোমরের মাপ দিয়ে স্থূলতার ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু এসব মাপ থেকে শরীরের ভেতরে ঠিক কোথায় কতটা চর্বি জমেছে, তা সব সময় বোঝা সম্ভব নয়।
একই বিএমআই থাকা দুই ব্যক্তির শরীরে ভিসেরাল ফ্যাটের পরিমাণ আলাদা হতে পারে। আবার পেশিবহুল কোনো পুরুষের বিএমআই বেশি হলেও তাঁর পেটের গভীরে চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকতে পারে।
অন্যদিকে, স্বাভাবিক ওজনের কারও পেটের ভেতরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে। তাই হরমোনের স্বাস্থ্য মূল্যায়নে শুধু বয়স বা ওজন নয়, শরীরে চর্বির বণ্টনও বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কীভাবে পেটের চর্বি টেস্টোস্টেরনে প্রভাব ফেলতে পারে?
ভিসেরাল ফ্যাট ও টেস্টোস্টেরনের মধ্যে সম্পর্কের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে গবেষকেরা কয়েকটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
পেটের গভীরে অতিরিক্ত চর্বি জমলে ইনসুলিন প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে শরীরের স্বাভাবিক বিপাকীয় কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অণ্ডকোষে টেস্টোস্টেরন উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া ভিসেরাল ফ্যাট শরীরে প্রদাহজনিত প্রক্রিয়া বাড়াতে পারে। হরমোনের সংকেত আদান-প্রদান এবং টেস্টোস্টেরন থেকে ইস্ট্রাডিওল তৈরির প্রক্রিয়াতেও এর ভূমিকা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এসব সম্ভাব্য প্রক্রিয়া আরও ভালোভাবে বুঝতে অতিরিক্ত গবেষণা প্রয়োজন।
পেটের চর্বি কমাতে কী করা যায়?
পেটের অতিরিক্ত চর্বি কমানো এবং সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
তবে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু পেটের মেদ কমালেই সবার হরমোনের সমস্যা সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ক্লান্তি, যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক উপসর্গ ও পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে হরমোনের মাত্রা মূল্যায়ন করতে পারেন।
টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বা হরমোনের ওষুধ সবার জন্য উপযুক্ত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পেটে ভুঁড়ি থাকলেই কারও টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি রয়েছে বা যৌনক্ষমতা কমে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে আসা যায় না। গবেষণাটি পেটের গভীরে জমে থাকা চর্বি ও টেস্টোস্টেরনের মাত্রার মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরেছে; এই সম্পর্কের প্রকৃতি ও কারণ নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
