![]()
স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল
বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের নাম শুধু রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জাতির আত্মপরিচয়, রাষ্ট্রচিন্তা ও জাতীয় চেতনার সঙ্গে স্পর্শে কাজ করে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেমনই একজন। তাঁকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি—তিনি কি সত্যিই স্বাধীনতার ঘোষক? নাকি ইতিহাস তাঁকে অন্য এক বৃহত্তর পরিচয়ে স্মরণ করবে?
রাষ্ট্রীয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, এই প্রশ্নের উত্তর কেবল “ঘোষক” শব্দে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের এক অগ্রসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধা এবং পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের অন্যতম ফাউন্ডিং ফাদার।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের উত্তাল প্রেক্ষাপটে যখন পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যায় গোটা জাতি দিশেহারা, তখন চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। ইতিহাসের এই অংশটি আজ আর বিতর্কের নয়; বরং এটি একটি বাস্তব সত্য যে, সেই ঘোষণাটি মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা তৈরি করেছিল। যুদ্ধরত একটি জাতির জন্য সাহস, সংগঠন ও মনোবলের গুরুত্ব অপরিসীম। জিয়ার কণ্ঠ সেই সময়ে জাতির যুদ্ধচেতনায় আগুন জ্বালিয়েছিল।
কিন্তু জিয়াউর রহমানের অবদান কেবল এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁকে “ফাউন্ডিং ফাদার” বলার পেছনে রয়েছে আরও গভীর বাস্তবতা। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর পর বাংলাদেশ যখন পরিকল্পিত রাষ্ট্রের অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক ভাঙন ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় বিপর্যস্ত, তখন রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করার জন্য জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের প্রটোকল ভেঙে দায়িত্ব নেন। তিনি বুঝেছিলেন—দেশটাকে পুনরুজ্জীবিত করা অতীব জরুরি। না হলে দেশ তলানিতে চলে যাবে। রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থাকবে না।
তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার মূল ছিল “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”। এই দর্শনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের জনগণকে একটি ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রসত্তার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস নেন। তিনি রাষ্ট্রকে কেবল দলীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে না রেখে একটি বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়ের দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার, গ্রামমুখী উন্নয়ন, কৃষি ও উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার—এসব ছিল তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপ।
সবচেয়ে বড় কথা, তিনি একটি ভঙ্গুর বাংলাদেশ থেকে স্বচ্ছল বাংলাদেশ চেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানকে ফাউন্ডিং ফাদার হিসেবে উপাধি দেওয়া হোক। জাতির কাছে আমার প্রশ্ন – তাঁকে কেন ফাউন্ডিং ফাদার উপাধি দেওয়া হবে না?
সমালোচকেরা হয়তো বলবেন, জিয়ার শাসনামলে সামরিক প্রভাব ছিল; ইতিহাসে তাঁর কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কও আছে। কিন্তু রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে অনেক নেতার ভূমিকাই জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে মূল্যায়িত হয়। আবেগ নয়, বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়—স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশকে কার্যকর রাষ্ট্রে রূপ দিতে জিয়াউর রহমান একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছেন।
সুতরাং, জিয়াউর রহমানকে কেবল “স্বাধীনতার ঘোষক বলে ছোট করা নয়, তাকে ফাউন্ডিং ফাদার হিসেবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে উচ্চ স্থানে রাখা হোক বলে আমি মনে করি। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সেনানায়ক, স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী এক ঐতিহাসিক কণ্ঠ, এবং একইসঙ্গে আধুনিক বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ফাউন্ডিং ফাদার হিসেবে রাষ্ট্রীয় ভিত্তি পুনর্গঠনের অন্যতম স্থপতি।
ইতিহাসের আদালতে তাই জিয়াউর রহমান শুধু একটি নাম নন—তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভেতরে সীমাবদ্ধ করে দেখা ইতিহাসের প্রতি অবিচার। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সেনানায়ক, স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী ঐতিহাসিক কণ্ঠ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের পুনর্গঠনের অন্যতম স্থপতি। তাঁর রাষ্ট্রীয় দর্শন, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার রাজনৈতিক অঙ্গীকার আজও রাষ্ট্রচিন্তায় গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।
একজন ফাউন্ডিং ফাদার কেবল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মুহূর্তে ভূমিকা রাখেন না; তিনি জাতির ভবিষ্যৎ পথরেখাও নির্মাণ করেন। সেই অর্থে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বহুদলীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, জাতীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয় গঠনে এক অনন্য অবদান রেখেছেন। ইতিহাস তাই তাঁকে শুধু একটি বিতর্কিত চরিত্র হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের অন্যতম ভিত্তিনির্মাতা হিসেবেই স্মরণ করা উচিত।
লেখক: স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল (সিইও, প্রতিষ্ঠাতা: বাংলাদেশ সাপোর্টার্স ফোরাম)
[বি.দ্র. : এটি কারো প্রতি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মতামত রয়েছে। রাষ্ট্রীয়বাদী ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেলের নিজস্ব মতের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা। ]
