![]()
নিউজ প্রোভাইডার
সুফিবাদ গবেষণা ফাউন্ডেশনের ১১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সভাপতির স্বাগত বক্তব্যে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সুফি মোবারক হোসেন মুরাদ পাঠ্যপুস্তকে সুফিজম অন্তর্ভুক্তির জোর দাবি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে সুফিবাদের শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশে সুফিবাদের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শান্তি, সম্প্রীতি এবং আত্মশুদ্ধির বার্তা ছড়াতে পাঠ্যসূচিতে অবিলম্বে সুফিবাদ যুক্ত করা প্রয়োজন।
শুক্রবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে সুফিবাদ গবেষণা ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ‘সুফিবাদ বিষয়ক শিক্ষা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে ষষ্ঠ থেকে নবম/দশম শ্রেণি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করে পাঠদান’ শীর্ষক এ সভায় শিক্ষা ব্যবস্থায় সুফিবাদ বিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আবদুর রহমান মিয়াজী।
তিনি তাঁর বক্তব্যে দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও পরিবর্তনের ওপর জোর দেন। যুগের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে একটি যুগোপযোগী ও নৈতিকতা-ভিত্তিক শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার জন্য তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশেষ আবেদন জানান। ড. মিয়াজী বলেন, মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে যা শিক্ষার্থীদের দক্ষ, মানবিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। তিনি সুফিবাদের মূলধারা ও এর মানবিক দর্শন তুলে ধরেন।
প্রধান আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
তিনি সুফি কবি কাজী নজরুলের আধ্যাত্মিক দর্শনের এক অনন্য দিক তুলে ধরে বলেন, নজরুল কেবল সাম্য ও বিদ্রোহের কবি ছিলেন না; বরং তাঁর সৃষ্টিজুড়ে ছিল গভীর আধ্যাত্মিকতা ও সুফিবাদ। নজরুলের ইসলামী গান, গজল এবং শ্যামাসংগীতের অন্তরালে যে পরম সত্তার প্রতি আকুলতা, তা মূলত সুফি দর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ। জাকির হোসেন জোর দিয়ে বলেন, কবি মানুষের ভেতরের খোদা বা ঐশ্বরিক শক্তিকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। ধর্মের বাহ্যিক আচার-সর্বস্বতার ঊর্ধ্বে উঠে নজরুল হৃদয়ের পবিত্রতা ও মানবতার মাধ্যমে স্রষ্টাকে খোঁজার যে বার্তা দিয়েছেন, তা-ই তাঁর আধ্যাত্মিকতার মূল ভিত্তি।
এই আধ্যাত্মিক চেতনা নজরুলকে সংকীর্ণতামুক্ত এক উদার অসাম্প্রদায়িক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল, যা বর্তমান সমাজেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
মুখ্য আলোচক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আহসানুল হাদি তাঁর বক্তব্যে সুফিবাদের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সুফিবাদ কোনো আকস্মিক বা হঠাৎ করে তৈরি হওয়া ধারণা নয়। বরং ইসলামের ইতিহাসের শুরু থেকেই এর গভীর ভিত্তি রয়েছে।
আলোচনায় তিনি সুফিবাদের মূল উৎস হিসেবে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ‘আসহাবে সুফ্ফা’ বা সুফ্ফাবাসীদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে মদিনার মসজিদে নববীর একটি নির্দিষ্ট চত্বরে (সুফ্ফা) যেসকল ত্যাগী, জিকির ও ইলম চর্চায় মগ্ন সাহাবিগণ অবস্থান করতেন, তাঁদের আধ্যাত্মিক জীবনধারা এবং আত্মশুদ্ধির প্রয়াসই পরবর্তী সময়ে সুফিবাদের মূল প্রেরণা ও উৎস হিসেবে রূপ লাভ করে। সুতরাং, ইসলামের মৌলিক আদর্শ ও নবীজির সাহাবিদের জীবনচর্যার ধারাবাহিকতাতেই সুফিবাদের বিকাশ ঘটেছে, এটি হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়েনি।
উদ্বোধনী বক্তব্যে বকশিবাজার দরবার শরীফের গদ্দিনশীন পীর শাহসূফি সাঈদ আনোয়ার মোবারকী আলকাদরী বলেন, সুফিবাদ কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানুষের আত্মিক শুদ্ধি, মহব্বত ও পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়। সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সুফি দর্শনের চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন। বর্তমান অস্থির সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই মানবিক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিশেষ অতিথি ছিলেন, কাজী নজরুল সুফি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক,নজরুল গবেষক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার গাজী নাফিস আহমেদ, সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের সভাপতি শেখ মোহাম্মদ শাহ কামাল শ্যামল, শাহসুফি ফিরোজ চিশতি প্রমূখ। সুফিবাদ গবেষণা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা-চেয়ারম্যান সুফি মোবারক হোসেন মুরাদের সভাপতিত্বে সভা পরিচালনা করেন সংগঠনের সদস্য সচিব আলহাজ মোজাফফর আহমেদ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বক্তারা বলেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অসহিষ্ণুতা ও বিভাজন কমিয়ে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে সুফিবাদের শিক্ষা সহায়ক হতে পারে। তাই জাতীয় শিক্ষাক্রমে সুফিবাদ বিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আলোচনা সভা শেষে মিলাদ,দোয়া ও তাবারুখ বিতরনের মাধ্যমে ১১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সমাপ্ত হয়।
