![]()
কে-পপ শিল্পের অন্যতম দুই পরাশক্তি বিটিএস এবং স্ট্রে কিডস ঘোষণা করেছে, তারা ২০২৭ সালের গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে অংশগ্রহণের জন্য তাদের কোনো গান জমা দেবে না। গ্র্যামির আয়োজক ‘রেকর্ডিং একাডেমি’র নতুন চালু করা ‘বেস্ট এশিয়ান পপ’ বিভাগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্কের জেরেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যান্ড দুটি। বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয় দুটি দলের এই বয়কট গ্র্যামি কর্তৃপক্ষের জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: আলাদা বিভাগ বনাম মূলধারা
গত বছরের জুনে রেকর্ডিং একাডেমি ‘বেস্ট এশিয়ান পপ’ নামে একটি নতুন পুরস্কার চালুর ঘোষণা দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এশীয় সংগীতের শৈল্পিক উৎকর্ষকে বিশ্বমঞ্চে বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া। তবে এই উদ্যোগ পপসংগীত জগতে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
শিল্পীদের একাংশ ও বিশ্বসংগীত বিশ্লেষকদের মতে, আলাদা বিভাগ চালুর ফলে কে-পপ বা জে-পপের মতো ধারার সংগীত মূলধারার প্রতিযোগিতা (যেমন—’অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ বা ‘সং অব দ্য ইয়ার’) থেকে ছিটকে পড়তে পারে। তারা আশঙ্কা করছেন, এই ধরনের উদ্যোগ মূলত বৈশ্বিক সংগীতকে মূলধারা থেকে আলাদা করে একধরনের ‘সীমানাপ্রাচীর’ তৈরি করবে।
এর আগে লাতিন সংগীতের জন্য ‘বেস্ট মিউজিকা উরবানা’ বিভাগ চালু করার পরও একই ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।
“আমরা চাই আমাদের সংগীতকে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা ভাষার গণ্ডিতে না বেঁধে তার নিজস্ব পরিচয়ে শোনা ও ভালোবাসা হোক।”
— বিটিএসের জুলাই মাসের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।
স্ট্রে কিডস ও বিটিএসের সুনির্দিষ্ট অবস্থান
চলতি বছরের জুলাই মাসে বিটিএস প্রথম ঘোষণা দেয় যে, তারা গ্র্যামির কোনো বিভাগেই গান বিবেচনা করার জন্য জমা দেবে না। এর ধারাবাহিকতায় এবার স্ট্রে কিডসের রেকর্ড লেবেল ‘জেওয়াইপি এন্টারটেইনমেন্ট’ নিশ্চিত করেছে, তারাও কোনো গান জমা দিচ্ছে না।
আগস্টে নতুন অ্যালবাম ‘দিস অ্যান্ড দ্যাট’-এর প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্ট্রে কিডস সদস্য হোয়াং হিয়ন-জিন বলেন, “পুরস্কার বা রেকর্ড কখনো আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল না। আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার সবসময় ভক্তদের সন্তুষ্টি।”
উল্লেখ্য, স্ট্রে কিডসের আট সদস্য এবং বিটিএসের সদস্যরা সবাই স্বয়ং রেকর্ডিং একাডেমির অফিশিয়াল ভোটার। ভোটার হয়েও বিশ্বসেরা এই প্ল্যাটফর্মে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত সংগীতাঙ্গনে এক নজিরবিহীন বার্তা দিয়েছে।
অন্যান্য কে-পপ শিল্পীরাও এই বয়কটের প্রতি তাদের সমর্থন প্রকাশ করছেন। কে-পপ ব্যান্ড ‘এটিজ’-এর নেতা কিম হং-জুং জানান, বিটিএস ও স্ট্রে কিডসের এই অবস্থান তাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে এবং তিনিও একই পথ অনুসরণের বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
ভাষার শর্ত ও যোগ্যতার প্রশ্ন
নতুন চালু হওয়া ‘বেস্ট এশিয়ান পপ’ বিভাগের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য শর্ত হলো—গানে যেকোনো এশীয় ভাষার অর্থবহ ব্যবহার থাকতে হবে।
এই শর্তের কারণে মার্কিন ও বৈশ্বিক বাজারের জন্য তৈরি বিটিএস বা ব্ল্যাকপিংকের মতো শীর্ষ সারির দলের সাম্প্রতিক জনপ্রিয় ইংরেজি গানগুলো এই নতুন বিভাগের যোগ্যতার বাইরে পড়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন বিভাগটি নিয়ে আপত্তি ও বিভ্রান্তি আরও জোরদার হয়েছে।
রেকর্ডিং একাডেমির অবস্থান
শিল্পীদের বয়কট ও তীব্র সমালোচনার পরও নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসছে না রেকর্ডিং একাডেমি। ২০২৭ সালের গ্র্যামি অনুষ্ঠানে ‘এশিয়ান পপ’ বিভাগটি রাখা হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংস্থাটির প্রধান হার্ভে ম্যাসন জুনিয়র।
তিনি জানান, সিদ্ধান্তটি নেওয়ার আগে এশিয়ার সংগীতাঙ্গনের বহু বিশেষজ্ঞ ও শিল্পীর সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে। অনেকে এর বিরোধিতা করলেও অনেকেই ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। ম্যাসন জুনিয়র বলেন, “এই সিদ্ধান্তে হয়তো সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়, তবে এশিয়ার সংগীতকে যথাযথ মর্যাদায় তুলে ধরতে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।”
বৈশ্বিক সংগীতাঙ্গনে প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্ট্রে কিডসের অবস্থান এখন বেশ মজবুত। দ্য বিটলসের পর একমাত্র স্ট্রে কিডস ব্যান্ড হিসেবে আমেরিকার অ্যালবামের শীর্ষ তালিকায় পর পর ৯টি অ্যালবাম এক নম্বরে আনার রেকর্ড গড়েছে। সম্প্রতি নিউইয়র্কের গভর্নরস বল উৎসব এবং রিও ডি জেনিরোর ‘রক ইন রিও’-তে তারা প্রধান আকর্ষণ হিসেবে পারফর্ম করেছে।
বিটিএস ও স্ট্রে কিডসের মতো বৈশ্বিক বাণিজ্যিকভাবে সফল দুই কে-পপ জায়ান্টের অনুপস্থিতি গ্র্যামির আন্তর্জাতিক দর্শকপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংগীত বিশ্লেষকরা।
