![]()
নেপাল ও তিব্বতের হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পানি নামতে শুরু করলেও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে। কোথাও নদীর তীরে ভেসে উঠছে মরদেহ, আবার কোথাও ঘন কাদার নিচ থেকে মিলছে নিখোঁজ মানুষের দেহ। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে নেপালের বিভিন্ন মর্গে মরদেহ রাখার জায়গা ফুরিয়ে গেছে। ফলে মরদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্তকরণের সংকটের মধ্যেই গণকবর দেওয়ার কাজ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
রোববার (৩০ আগস্ট) পর্যন্ত নেপাল ও তিব্বতে বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮০৪ জনে। তবে এখনো ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহ এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে স্বাভাবিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার অনেক মরদেহ নিজ বাড়ি থেকে বহু দূরে ভেসে গিয়ে উদ্ধার হওয়ায় স্বজনদের জন্য পরিচয় শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মরদেহ সংরক্ষণের জায়গা সংকট দেখা দেওয়ায় ভারতপুরে গণকবর দেওয়া শুরু হয়েছে। প্রতিটি মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর ট্যাগ ও অবস্থান নম্বর দেওয়া হচ্ছে। এরপর প্লাস্টিকের ব্যাগে মুড়িয়ে অগভীর কবরে রাখা হচ্ছে। পুলিশের আশা, ভবিষ্যতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে স্বজনেরা মরদেহ শনাক্ত করতে পারবেন এবং যথাযথ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে প্রায় ১০০ মাইল ভাটিতে অবস্থিত চিতওয়ানে নদীর তীরে এখন পর্যন্ত ২৫০টির বেশি মরদেহ ভেসে এসেছে। তবে মরদেহগুলোর অবস্থা এতটাই বিকৃত যে মাত্র নয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদের অন্তত সাময়িকভাবে শহরের প্রান্তবর্তী বনাঞ্চলে দাফনের প্রস্তুতি চলছে।
মরদেহ শনাক্তে স্থানীয় প্রশাসনকে নিতে হচ্ছে হৃদয়বিদারক নানা উদ্যোগ। স্বজনদের উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি দেখিয়ে পরিচিত কোনো চিহ্ন খুঁজতে বলা হচ্ছে—গলার হার, বিয়ের আংটি, ট্যাটু কিংবা শরীরের কোনো পুরোনো দাগ। মরদেহের ছবি উপস্থাপনার মাধ্যমে স্বজনদের দেখানো হচ্ছে। নেপাল পুলিশের ওয়েবসাইটেও এসব ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। রাজধানী কাঠমান্ডুর মর্গের বাইরের দেয়ালেও টানানো হয়েছে মরদেহের ছবি।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকায় পুরো গ্রামই কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এসব এলাকায় এখনো সড়কপথে পৌঁছানো সম্ভব নয়। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সেখানে যাতায়াত ও উদ্ধারকাজ চালাতে হচ্ছে।
নেপালের পররাষ্ট্রসচিব অমৃত বাহাদুর রাই জানিয়েছেন, মরদেহ নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য সরকার এক হাজারের বেশি ফ্রিজার ইউনিট চেয়েছে।
ত্রিশূলী নদীর তীরে অবস্থিত দেবীঘাট শহরেও চলছে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মরদেহ উদ্ধারের কাজ। ভয়াবহ বন্যায় শহরটির বহু বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে। উদ্ধারকারীরা ঘন কাদার নিচ থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।
পুলিশ সুপার অমরদত্ত ভট্ট বলেন, দেবীঘাটের একটি এলাকা থেকে এরই মধ্যে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কাদার নিচে আরও মরদেহ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বন্যায় বেশির ভাগ বাড়ির নিচতলা ও দোতলা ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরো কাদা সরাতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে বেঁচে যাওয়া মানুষের জীবনও এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ৪৯ বছর বয়সী উষা নেপালি তার ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, বাড়িটি তৈরিতে তিনি তার সবকিছু বিনিয়োগ করেছিলেন। এখন সেখানে পড়ে আছে শুধু কয়েকটি কংক্রিটের ব্লক ও পেঁচানো ধাতব কাঠামো। তার ভাষায়, ‘নদী আমাদের সবকিছু নিয়ে গেছে।’
দেবীঘাটের আরেক বাসিন্দা জামুনা মাগার বলেন, বন্যার সতর্কবার্তা পাওয়ার পর কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি শুধু কিছু সোনা নিয়ে বের হতে পেরেছিলেন। ঘরের সবকিছু পানিতে ভেসে গেছে, এমনকি ফ্রিজটিও। এখন সন্তানদের জীবন নিয়ে আতঙ্কে তিনি আর সেখানে থাকতে চান না।
তার আশঙ্কা, দেবীঘাটকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর নেপালজুড়ে এখন চলছে নিখোঁজদের সন্ধান, মরদেহ উদ্ধার ও পরিচয় শনাক্তের প্রাণপণ চেষ্টা। তবে দুর্গম এলাকা, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক যোগাযোগ এবং বিপুলসংখ্যক নিখোঁজ মানুষের কারণে উদ্ধার অভিযান যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বাড়ছে স্বজনহারাদের উদ্বেগ ও শোক।
