![]()
কোনো এক কালে বাংলার বীর দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রিয়তমা সহধর্মিনী বেগম লুৎফুন্নিসার পিতৃভূমি ও পূর্ব পুরুষদের আবাসস্থল ছিল নৈসগিক সৌন্দর্যের শহর গোয়া। আর লুৎফুন্নিসার মাতৃভূমি ছিল মুম্বাই, তবে লুৎফুন্নিসার জন্ম -১৯.সেপ্টেম্বর.১৭৩৪ সালে রূপসী বাংলায়। তাঁর ভাই ইরান খান, পিতা- ইরাজ খান, মাতা- গুলশান আরা, দাদাজান- আকবর কুলি খান।
১৭৫৭-র ২-জুলাই নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বাংলার জমিনে ষড়যন্ত্রকারীরা শহীদ করার পর নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের বাকি সদস্যদের সাথে বেগম লুৎফুন্নিসা পরিবারের অনেককেই বন্দী করে ঢাকায় পাঠানো হয়। বন্দী জীবন থেকে মুক্ত হওয়ার পর কিছু কাল মুর্শিদাবাদে অবস্থানের পর, বেগম লুৎফুন্নিসা পরিবারের অনেকেই ভারতের মুম্বাই ও গোয়াতে অবস্থান করেন। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলার দেশপ্রেমী বীর নবাব সিরাজউদ্দৌলার সহধর্মিনী বেগম লুৎফুন্নিসা ও তাঁর ভাই ইরান খান বংশধারার ৭ম গর্বিত বংশধর মহীয়সী নারী গুলশান আরা বেগমের পিতৃভূমি ও জন্মভূমি ভারতের বর্তমান গোয়া রাজ্যে। আর মাতৃ ভূমি ভারতের মুম্বাই-এ।
গুলশান আরা বেগম ১৫.মে.১৯১৯ইং সালে ভারতের বর্তমান ‘গোয়া রাজ্যের একটি ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গোলাম আব্বাস। মাতার নাম রওশন আরা বেগম। আর তিনি বাংলার দেশপ্রেমী বীর নবাব সিরাজউদ্দৌলার সহধর্মিনী বেগম লুৎফুন্নিসা ও তাঁর ভাই ইরান খান বংশধারার ৭ম গর্বিত বংশধর।
খুব অল্প বয়সে তিনি ভারতের বীর টিপু সুলতান পরিবার রক্তধারার অন্যতম বংশধর বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাক্তার সৈয়দ নাসির আলী মির্জা ওরফে নাসির হোসেন -এর সঙ্গে পরিবারিক সম্মতিতে নিকাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শাদীর পর তিনি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় তাঁর স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেন।
তাঁদের বৈবাহিক জীবনের প্রথম সন্তান মোবারক হোসেনের জন্ম হয় ১৯৫৩ সালে। ১৯.মার্চ.১৯৫৭ ইং সালে কন্যা সন্তান সৈয়দা হোসনে আরা বেগম এর জন্ম হয়। তাঁদের কন্যা সৈয়দা হোসনে আরা বেগমের স্বামী সৈয়দ গোলাম মোস্তাফা একজন স্বনামধন্য প্রকৌশলী হিসাবে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। সৈয়দ গোলাম মোস্তাফা বাংলার বীর নবাব সিরাজউদ্দৌলা রক্তধারার সরাসরি ৮ম বংশধর। সৈয়দা হোসনে আরা বেগম এবং প্রকৌশলী সৈয়দ গোলাম মোস্তাফা দম্পতির কৃতি সন্তান সৈয়দ গোলাম আব্বাস আরেব ওরফে নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা।
গুলশান আরা বেগম অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান করেছিলেন। তিনি সাহসিকতার সঙ্গে দো-নলা বন্দুক চালাতে পারতেন বাড়ির নিরাপত্তার স্বার্থে। তিনি তাঁর সন্তানদের সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। তাঁর প্রথম সন্তান মোবারক হোসেন নিঃসন্তান।
গুলশান আরা বেগম ছিলেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারিণী। সর্বদা নিয়মমাফিক নামাজ ও কোরআন তেলোয়াত করতেন আল্লাহ ও আহলেবাইতের ধ্যানে মশগুল থাকতেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর, যা কিনা বয়সের সাথে বিন্দুমাত্র লোপ পায়নি। তাঁর বুদ্ধিমত্তা তার সন্তান এবং আপনজন প্রিয়জনদের মধ্যে অমর হয়ে আছে, থাকবে।
তিনি কখনো কাউকে কষ্ট দেননি। দু’হাত তুলে সব সময় তিনি, বাংলার সবার জন্য দোয়া করতেন এবং কেউ তাকে সালাম করলে মাথায় হাত দিয়ে আশির্বাদ করতেন দুয়া করতেন। আর, সেই শিক্ষাটা তিনি অর্জন করেছেন পরিবার থেকেই।
ঐতিহ্যবাহী বেগম লুৎফুন্নিসা পরিবারের সকলেই বাংলার মানুষ-পরিবশে-প্রকৃতি নিয়ে কাজ করেছেন সারাজীবন। সেই ধারাবাহিকতায় তিনিও জড়িয়েছিলেন মানব কল্যাণমূলক সব কাজে। সংসার সামলে তিনি সীমিত পরিসরে মানবসেবামূলক স্মরণীয় বেশকিছু কাজ করেছেন।
পোশাকের বেলায় গুলশান আরা বেগম সবসময় বেছে নেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী ইসলামি পোশাক। তাঁর পোশাকের নকশাগুলো ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করে। নিজ হাতে তৈরি হস্তশিল্পের জন্য সকলে তাঁর প্রশংসা করেন। এছাড়া তিনি নানা ধরনের বাহারি রুপার গয়না পরতেন। ছবি আঁকায় খুঁজে পান আনন্দ। আঁকা শুরু করলে কখন যে সকাল থেকে সন্ধ্যা গড়িয়ে যায় বুঝতে পারেন না।
তাঁর অতীত কর্মজীবনের দিকে দেখলে বোঝা যায় ব্যস্ত থাকতেই বেশি পছন্দ করতেন মহীয়সী এই নারী। শত কর্মব্যস্ততার মাঝেও চলেছে প্রকৃতির মাঝে ঘোরাঘুরি। বাংলার ঘাস, ফুল, নদী, পাহাড়, হ্রদ আর ঝরণা ছিল তাঁর প্রিয়জন। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি তাঁর প্রবল টান ও আকর্ষণ ছিল। তাইতো জীবনের অধিকাংশ সময় বাংলার প্রকৃতির সেবায় কাটিয়েছেন।
বিশ্ব নারীকুলের শিরোমনি হযরত ফাতেমা ( আ. ) –এর অনুসারী মহীয়সী এই নারী ১৯৭৫ সালের ২৪ ‘মে’ মায়ার এই পৃথিবী থেকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে অন্য এক অজানা ভূবনে চলে যান।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী বেগম লুৎফুন্নিসা বেগম পরিবারের ৭ম রক্তধারা গুলশান আরা বেগম বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এক মসজিদের পাশ ঘেঁষেই চিরন্দ্রিায় শায়িত আছেন। তিনি চলে গেছেন ঠিকই তবুও তিনি রয়ে গেছেন সকলের হৃদয়ের গভীর কোণে, বছরের পর বছর, মাসের পর মাস, দিবা নিশি, ক্ষণে ক্ষণে।

কলমে : ফকরে আলম। সিনিয়র সাংবাদিক,বাংলাদেশ।
