![]()
দুই নারীর কাঁধে কেশবপুরের প্রশাসন ও নিরাপত্তা
ইতিহাসের নতুন অধ্যায়, জনমনে আস্থার আলো
জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:
যশোরের কেশবপুর উপজেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় সূচিত হয়েছে নতুন এক ইতিহাস। স্বাধীনতার পর এই প্রথম উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ দুটি দায়িত্ব— উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের নেতৃত্ব— একসঙ্গে দুই নারী কর্মকর্তার হাতে ন্যস্ত হয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যেই স্থানীয় জনমনে সৃষ্টি করেছে ব্যাপক আগ্রহ, ইতিবাচক আলোচনা এবং নতুন প্রত্যাশা।
বর্তমানে কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রেক্সোনা খাতুন এবং কেশবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন রোকসানা খাতুন। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের উপস্থিতিকে স্থানীয়রা দেখছেন সময়ের ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে।
দীর্ঘদিন ধরেই কেশবপুরবাসী একটি জনবান্ধব প্রশাসন ও কার্যকর আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রত্যাশা করে আসছিলেন। সেই প্রত্যাশার মাঝেই দুই নারী কর্মকর্তার নেতৃত্ব নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে স্থানীয়দের। বিশেষ করে নারী, শিশু ও সাধারণ ভুক্তভোগী মানুষের মধ্যে এই পরিবর্তন তৈরি করেছে বাড়তি আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ।
ইতোমধ্যেই ইউএনও রেক্সোনা খাতুন তাঁর কর্মদক্ষতা, সততা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকি, সরকারি সেবার মানোন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নয়ন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং জনভোগান্তি নিরসনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা স্থানীয়দের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বিশেষ করে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, বাজার মনিটরিং, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ দ্রুত শুনে তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ তাঁকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, একজন প্রশাসক হিসেবে তিনি যেমন দায়িত্ব পালনে কঠোর, তেমনি সাধারণ মানুষের প্রতি মানবিক ও সহানুভূতিশীল।
স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, “রেক্সোনা খাতুন শুধু অফিসকেন্দ্রিক নন, তিনি মাঠপর্যায়ে গিয়ে মানুষের সমস্যার কথা শোনেন। সাধারণ মানুষ যেন সহজে সরকারি সেবা পায়, সে বিষয়েও তিনি আন্তরিক। এ কারণেই তাঁর প্রতি মানুষের আলাদা আস্থা তৈরি হয়েছে।”
অন্যদিকে সদ্য যোগদানকারী ওসি রোকসানা খাতুনকে ঘিরেও মানুষের প্রত্যাশা অনেক। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি আমাদের প্রতিবেদক জেমস আব্দুর রহিম রানাকে বলেন, “কেশবপুরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করবো। থানাকে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় পরিণত করাই আমার মূল লক্ষ্য।”
তিনি আরও বলেন, “নারী, শিশু ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। মাদক, সন্ত্রাস, বাল্যবিবাহ ও সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। জনগণের সহযোগিতা নিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ কেশবপুর গড়ে তুলতে চাই।”
ওসি রোকসানা খাতুনের এই বক্তব্য ইতোমধ্যেই স্থানীয়দের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে নারীরা মনে করছেন, একজন নারী ওসি থাকায় তারা নিজেদের সমস্যাগুলো আরও সহজে ও নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারবেন। অনেক অভিভাবকও আশা করছেন, তাঁর নেতৃত্বে ইভটিজিং, মাদক ও কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পরিবর্তন আসবে।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, কেশবপুরের প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। ফলে বিষয়টি এখন শুধু প্রশাসনিক বাস্তবতা নয়; বরং সমাজে নারী নেতৃত্বের অগ্রযাত্রারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দুই নারী কর্মকর্তাকে ঘিরে ইতিবাচক আলোচনা লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় তরুণ সমাজের মতে, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদে নারীদের উপস্থিতি সমাজে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে এবং নতুন প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করবে।
এলাকার সচেতন মহলের অনেকে মনে করছেন, নারীদের নেতৃত্বে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মানবিকতার সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্বও কমে আসবে। বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ভুক্তভোগীরা আরও সাহস নিয়ে প্রশাসনের কাছে যেতে পারবেন বলেও আশা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, “রেক্সোনা খাতুন একজন মানবিক ইউএনও। তিনি মাঠপর্যায়ে গিয়ে মানুষের সমস্যার কথা শোনেন। সাধারণ মানুষ যেন সহজে সরকারি সেবা পায়, সে বিষয়েও তিনি আন্তরিক। এ কারণেই তাঁর প্রতি মানুষের আলাদা আস্থা তৈরি হয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। সরকারের নারী ক্ষমতায়ন নীতির ফলে নারীরা এখন শুধু অংশগ্রহণেই সীমাবদ্ধ নন, নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। কেশবপুরের বর্তমান বাস্তবতা সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
প্রশাসনের দায়িত্ব কেবল দাপ্তরিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, আস্থা ও প্রত্যাশা। সেই জায়গা থেকেই কেশবপুরবাসী এখন তাকিয়ে আছেন এই দুই নারী কর্মকর্তার নেতৃত্বের দিকে। তাদের বিশ্বাস— সততা, সাহসিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে দুই নারীর হাত ধরেই কেশবপুর হয়ে উঠবে আরও শান্তিময়, নিরাপদ ও আধুনিক একটি জনপদ।
দুই নারী কর্মকর্তার এই যুগল নেতৃত্ব এখন কেশবপুরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বাজারের চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম— সর্বত্রই আলোচিত হচ্ছে তাদের নেতৃত্ব, কর্মদক্ষতা ও সম্ভাবনা। সাধারণ মানুষের চোখে এটি কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি আস্থার নতুন প্রতীক, নারী নেতৃত্বের শক্তিশালী বার্তা এবং নিরাপদ ও মানবিক কেশবপুর গড়ার এক নতুন প্রত্যয়ের নাম।
