![]()
পূর্বাকাশে ভোরের আলো ফোঁটার আগেই নদীর বুকে অলিখিত এক ব্যস্ততা শুরু হয়। চারপাশ জুড়ে শত শত নৌকার সারি, ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক আর জলপথে পণ্য লেনদেন। পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বেলুয়া নদীতে বসা বৈঠাকাটার ভাসমান হাটটি উপর থেকে দেখলে মনে হয় নদীর বুকেই গড়ে উঠেছে আস্ত এক গ্রাম।
প্রতি সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরে বসে এই ব্যতিক্রমী ভাসমান বাজার। সকাল ৫টা থেকে শুরু হয়ে হাট চলে ১০টা পর্যন্ত। স্থানীয়রা এই জলকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা ও বাণিজ্যকে মিলিয়ে নাম দিয়েছেন ‘বাংলার ভেনিস’।
এখানকার কেনাবেচা পুরোপুরি নদী ও নৌকানিরূপিত। পিরোজপুরের নাজিরপুর, নেছারাবাদ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বরিশাল ও বাগেরহাটের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কৃষকেরা নিজেদের পরম যত্নে উৎপাদিত ফসল নিয়ে আসেন এই হাটে।
কী বিক্রি হয় এই হাটে?
হাটে ঢুকলই চোখে পড়ে টাটকা শাকসবজি, সবজির চারা, মিষ্টি পান, নারকেল এবং স্থানীয় শস্য সামগ্রী। এমনকি সবজি চাষে ব্যবহৃত শ্যাওলা ও দুলালী লতার মতো উপাদানও মেলে এখানে। ভাসমান হাটে ঘুরে বেড়ায় সকালের নাস্তা কিংবা ভাতের ভাসমান দোকানও।
পাশ্ববর্তী এলাকা থেকে শ্যাওলা বিক্রি করতে আসা রাজীব শেখ জানান, “দেড়শ টাকা কুরি হিসেবে শ্যাওলা বিক্রি করি। বেচাবিক্রি যা হয়, তা দিয়ে সংসার চলে যায়।”
নৌকায় মিষ্টি কুমড়া নিয়ে আসা কৃষক রুহুল আমিন বলেন, “যার কাছে ভালো দাম পাব, তার কাছেই বিক্রি করব। এর আগের হাটে কচু এনেছিলাম। এই হাটে প্রচুর বেচাকেনা হয়।”
পাইকারি ক্রেতা ও কৃষকদের তথ্যমতে, মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার এই হাটে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকার পণ্য বেচাকেনা হয়। তবে তরমুজের মৌসুমে এই লেনদেন দেড় থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
পর্যটনের সম্ভাবনা ও ভোগান্তি
ব্যতিক্রমী এই ভাসমান হাট ও এর লাগোয়া প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ বাজার দেখতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা প্রায়ই এখানে আসেন। তবে সম্ভাবনাময় এই পর্যটন কেন্দ্রটিতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জালিস হাওলাদার জানান, “এখানে ঘুরতে এসে পর্যটকরা বেশ ভোগান্তিতে পড়েন। এখানকার রাস্তাঘাট একদমই সুবিধাজনক নয়। আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে এটি আরও বড় পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, যা স্থানীয়দের কর্মসংস্থান বাড়াবে।”
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সৌমিত্র সরকার জানান, এই ভাসমান হাটটি স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। প্রতিদিন খুব ভোরে পাইকাররা এসে কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কিনে ট্রলারে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেন।
স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার সংস্কার ও আবাসন সুবিধার উন্নয়ন করা গেলে ঐতিহ্যবাহী এই বৈঠাকাটা ভাসমান হাটটি কেবল দক্ষিণাঞ্চলের বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পেতে পারে।
