![]()
ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ শহরের পাহাড়ি সীমান্তজুড়ে এখন শুধু আত্মঘাতী ড্রোনের ভনভন শব্দ আর অনবরত কামানের বিকট গর্জন। দীর্ঘ চার বছরের যুদ্ধবিরতি ভেঙে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর উপকূলীয় মোখা বন্দর দখল করে নেওয়ার পর এবার দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ দখলের উদ্দেশ্যে তীব্র হামলা শুরু করেছে হুথি বিদ্রোহীরা। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়; কেবল চলতি মাসেই গৃহহীন হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ।
- 🚁 আকাশপথে ড্রোন হামলা: তাইজের পশ্চিম সীমান্তে ইরানি প্রযুক্তির ড্রোন ও ভারী মরটার ব্যবহার করে অগ্রসর হচ্ছে হুথিরা।
- 🌊 কৌশলগত মোখা বন্দর হাতছাড়া: লাল সাগরের মোখা বন্দর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ হুমকির মুখে পড়ায় বিশ্ববাজারে বেড়েছে তেলের দাম।
- 🏥 হাসপাতালে বেড খালি নেই: তাইজের আল-থাবরা হাসপাতালের আইসিইউতে উপচে পড়ছে আহত শিশু ও বেসামরিক নাগরিক।
- ⛺ ভয়াবহ বাস্তুচ্যুতি: চলতি মাসে ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ গৃহহীন; আগামী তিন মাসে আরও ১ লাখ পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা জাতিসংঘের।
ড্রোন ও কামানের গর্জনে নিস্তব্ধ পর্বতমালা
দক্ষিণ-পশ্চিম তাইজের পাহাড়ি সীমান্তে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সীমান্তরেখা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢালে বহু ঘরবাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলেও সেগুলো ফাঁকা ও পরিত্যক্ত—প্রাণভয়ে পালিয়ে গেছে পরিবারগুলো। এক কিলোমিটার দূরে সম্মুখসমরে গোলাগুলি ও মরটার শেলের শব্দ ছাড়া কোনো যানবাহনের শব্দ নেই।
ফ্রন্টলাইনের মাত্র ১ কিমি দূরে নিজ বাড়িতে ছাগলের পাল নিয়ে বসে থাকা অলি নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, তাঁর উঠানে দুটি মরটার শেল এসে পড়েছে। শিশুদের প্রাণ বাঁচাতে বাস্তুচ্যুতদের ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিলেও তিনি ও তাঁর স্ত্রী পালিত পশুপাল রক্ষায় থেকে গেছেন। তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, “আমি চরম আতঙ্কে আছি, কিন্তু আমার কোনো উপায় নেই। পশুপাল ফেলে গেলে আমরা অনাহারে এমনিতেই মারা যাব।”
কৌশলগত মোখা বন্দর দখল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর সংকট
গত ১০ সেপ্টেম্বর হুথি বিদ্রোহীরা তাইজ থেকে ৮৫ কিলোমিটার পশ্চিমে লোহিত সাগরের কৌশলগত মোখা বন্দরটি দখল করে নেয়। এর ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার আন্তর্জাতিক নৌপথ ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালীর ওপর বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা ও মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রায় ১০ লাখ মানুষের বাসভূমি তাইজ উত্তর ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ও দক্ষিণে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক স্বীকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল ও সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী শহরের কেন্দ্রস্থল ধরে রাখলেও হুথিরা পাহাড়ি উঁচু অবস্থানগুলো দখলের চেষ্টা করছে, যাতে সরকারি বাহিনীর পক্ষে মোখা পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আল-থাওরা হাসপাতালে আহাজারি: নিভে যাচ্ছে শিশুদের জীবন
তাইজের প্রধান আল-থাওরা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) কোনো বেড খালি নেই। চিকিৎসাধীনদের মধ্যে সেনা সদস্যদের পাশাপাশি রয়েছে বহু নিরপরাধ শিশু। ১২ বছরের শিশু ঘানা নাবিল ছাগল চড়ানোর সময় হুথিদের ছোড়া মরটার শেলের স্প্লিন্টারে মাথায় গুরুতর আঘাত পায়।
আইসিইউতে ব্যান্ডেজে মোড়ানো অবস্থায় জ্ঞানহীন পড়ে থাকা ঘানার বিষয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসক বিষণ্ণ কণ্ঠে বলেন, “মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতির কারণে শিশুটি হয়তো জ্ঞান ফিরে পেলেও আর কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না।”
দুই দিন ধরে হামাগুড়ি দিয়ে জীবন বাঁচানোর করুণ গল্প
তাইজ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে আল-মোনিগ বাস্তুচ্যুত ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে হাজারো পরিবার। হাঁটতে অক্ষম পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃদ্ধা ফাতিমা মোহাম্মদ সালেহ জানান, গ্রামে গোলাগুলি শুরু হলে সন্তানদের নাতি-নাতনিদের নিয়ে পালিয়ে যেতে বলেন তিনি। এরপর দুই দিন ধরে বোমার বিকট শব্দ আর গুলির মধ্য দিয়ে হাতের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে পথ চলেন তিনি।
ফাতিমা আকুতি জানিয়ে বলেন, “আমার মাথার ওপর বজ্রপাতের মতো বোমা পড়ছিল। আমি দুই দিন হামাগুড়ি দেওয়ার পর এক মোটরসাইকেল চালক আমাকে উদ্ধার করে এই ক্যাম্পে এনেছেন। আমার পরিবার কোথায় আছে, আমি জানি না।”
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) সতর্ক করে জানিয়েছে, গৃহযুদ্ধের পর সেপ্টেম্বর মাসেই নতুন করে ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছে এবং চলমান যুদ্ধে আরও লাখো মানুষের জীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
ইয়েমেন সংঘাত ও তাইজ পরিস্থিতির চিত্র
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| আক্রান্ত প্রধান অঞ্চল | তাইজ শহর, মোখা বন্দর এবং লাল সাগর উপকূল, ইয়েমেন। |
| সংঘাতের পক্ষসমূহ | ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী বনাম সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী। |
| কৌশলগত ক্ষতি | মোখা বন্দর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে। |
| জাতিসংঘের বাস্তুচ্যুতি হিসাব | চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ১,৩০,০০০+ মানুষ গৃহহীন (মোট বাস্তুচ্যুত ৫.২ মিলিয়ন)। |
