![]()
প্রযুক্তি
‘মায়া রাইড’: নারী চালকে নারী যাত্রীর নিরাপদ যাতায়াতের নতুন প্ল্যাটফর্ম
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন কাজের সুবাদে হাজারো নারী ছুটছেন। কেউ অফিসে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউবা আবার ব্যবসার কাজে। গন্তব্য তাদের আলাদা। কিন্তু পথে একটা অস্বস্তি যেন প্রায় সবারই চেনা। বাসে উঠলেই ঠাসাঠাসি ভিড়, হেলপার বা সহযাত্রীর অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ কিংবা যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার ভয়। একই ভয় সিএনজি ও রাইড-শেয়ারিং বাইকে।
যাত্রাপথে নারীদের এমন সব ভোগান্তি নিয়েই একদিন কথা হচ্ছিল ফাহাদ চৌধূরী ও তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের মধ্যে। ঢাকার পথে নারী যাত্রীরা কেমন সমস্যায় পড়েন, আবার একইসঙ্গে নারী বাইক চালকের দেখা পাওয়ার অভিজ্ঞতা—এসব কথার ভিড়ে জন্ম নেয় নারীদের জন্য নারী চালক দ্বারা রাইড শেয়ারিংয়ের ভাবনা।
“আমি ঢাকায় প্রায়ই দেখতাম বাইকে বসে অনেক আপুই কম্ফোর্ট ফিল করছে না। নিজেও ভাবতাম, আমার ক্ষেত্রেও এমনটা হলে হয়তো ভালো লাগত না। এই বিষয়টা আমার মাথায় খুব করে গেঁথে যায়।” — জান্নাতুল ফেরদৌস
মায়া রাইডের যাত্রা শুরু
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে চালু হয় মায়া রাইডের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেইজ। এরপর কিছুদিন পার হলে অনেক নারী বাইক চালক নিজ থেকেই কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। শুরুতেই যুক্ত হন ৪ জন। ধীরে ধীরে সে সংখ্যা বাড়তে থাকে। মাত্র চার মাসের মাথায় রাইডারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৭০ জনে। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন বর্তমানে সক্রিয়ভাবে রাইড দিচ্ছেন।
অবশ্য শুরুতে বাইক চালকদের কাছ থেকেই বেশি সাড়া মিললেও নিজেদের গাড়ি থাকা নারীরাও আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসেন। এখন মায়া রাইডের সাথে যুক্ত আছেন প্রায় ২৫ জন নারী কার চালক।
ঢাকায় উবার, পাঠাও-এর মতো পরিচিত রাইড শেয়ারিং সেবা থাকা সত্ত্বেও একজন নারী কেন নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম বেছে নেবেন—চ্যালেঞ্জটা ছিল ঠিক এখানেই। কিন্তু মাত্র ৪ মাসের মাথায় বাইক রাইড হয় ৩০০টিরও বেশি। একজন গ্রাহক তো ২২ বারেরও বেশি ‘মায়া রাইড’কে বেছে নিয়েছেন।
‘চিন্তাহীন যাতায়াত করতে পারি’
নুঝাত তাবাসসুম ৩০ বারের অধিক মায়া রাইডের সেবা নিয়েছেন। ঢাকার শ্যামলীর বাসিন্দা নুঝাত ২০২৩ সাল থেকে নিয়মিত গুলশান-১-এ অফিসে যাতায়াত করেন। নিজের গাড়ি থাকলেও সবসময় সেটি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
“এইটা সত্য যে পাঠাও উবারের তুলনায় এটায় খরচ কিছুটা বেশি। কিন্তু এখানে যেভাবে নিজেকে সেইফ লাগে, চিন্তাহীন যাতায়াত করতে পারি, সেটির তুলনায় এই বাড়তি খরচটুকু সার্থক বলতে পারেন।” — নুঝাত তাবাসসুম, গ্রাহক
চালক যাচাই ও কমিশন
নারী যাত্রীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে চালকদের যুক্ত করার আগে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই করা হয়। ওয়েবসাইটে একটি ফর্ম পূরণ করতে হয় চালকদের—এরপর জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, চালকের ছবি, গাড়ি বা বাইকের নম্বর এবং যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহে রাখা হয়।
যারা খুব সম্প্রতি ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছেন কিংবা যাদের অভিজ্ঞতা খুব কম, তাদের দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হয় না। অন্তত এক থেকে দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকা রাইডারদের আগে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। রাইডারদের আয় থেকে ১০ শতাংশ কমিশন রাখা হয়।
প্রি-বুকিং সেবা ও কার সার্ভিস
অনেক নারী যাত্রী বাইকে অভ্যস্ত নন—তাদের চাহিদা থেকেই চালু হয় কার সার্ভিস। এটি মূলত সাপ্তাহিক ও মাসিক সাবস্ক্রিপশন ভিত্তিক। দুটি প্যাকেজ রয়েছে—’পিক আপ পয়েন্ট’ প্যাকেজে মাসিক খরচ আনুমানিক ৭,৩০০ টাকা এবং ‘ডোর টু ডোর’ প্যাকেজে ৯,২০০ টাকা।
বাইক রাইড সার্ভিসের ক্ষেত্রে আগের দিন রাত ১০টার মধ্যে বুকিং দিলেই রাইডার পৌঁছে যাবেন নির্ধারিত গন্তব্যে। ওয়েবসাইটে একটি ক্যালকুলেটর অ্যাপ্লিকেশন রয়েছে—যেখানে যাত্রার লোকেশন দিলে দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া দেখা যায়।
‘মায়া কিডস’ উদ্যোগ
মায়া রাইডের ভাবনা এখন শুধু কর্মজীবী নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্কুলগামী শিশুদের জন্যও চালু হয়েছে ‘মায়া কিডস’ ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম। ব্যস্ত বাবা-মায়ের সন্তানের স্কুলযাত্রা নিয়ে দুশ্চিন্তা কমানোই এর লক্ষ্য। এখন পর্যন্ত মায়া কিডসের প্রায় সাতজন গ্রাহক রয়েছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মায়া রাইড চলছে মূলত ওয়েবসাইটনির্ভর ব্যবস্থায়। তবে এটিকে আরও গোছানো ও নিয়মতান্ত্রিক করতে অ্যাপ তৈরির কাজ শুরু করেছেন ফাহাদ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী তিন মাসের মধ্যে অ্যাপটি চালু করার ইচ্ছা আছে। এতে গ্রাহক ও রাইডার দুজনেরই আলাদা রেকর্ড থাকবে।
“নারীরা কাজ করছেন অন্য নারীদের হেল্প করার উদ্দেশ্যে। ব্যাপারটা কত সুন্দর না?” — ফাহাদ চৌধুরী
মায়া রাইড শুধু যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভাবছে তা নয়—সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও। দেশে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ এমনিতেই সীমিত। বিশেষ করে রাইডিংয়ের মতো পেশায় নারীর সংখ্যা খুব নগণ্য। সেই জায়গায় একটি গাড়ি বা বাইক থাকা নারী চাইলেই নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারছেন।
