![]()
সকালের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের পারবাগুড়িয়া গ্রামের কাঁচা পথ ধরে একটি পুরোনো সাইকেল চলছে। হ্যান্ডেলে ঝোলানো ব্যাগ, ভেতরে খাতা-কলম। চালকের বয়স ৭৪। শরীরে বার্ধক্যের ক্লান্তি, কিন্তু পথচলায় থামার লক্ষণ নেই। এলাকার লোকজন তাকে চেনেন ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে। আনুষ্ঠানিক নাম লুৎফর রহমান।
গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সেই মানুষটিই দাঁড়ালেন সম্মাননার মঞ্চে। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে দেশের শতাধিক গুণী শিক্ষকের সঙ্গে তার হাতেও সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সঙ্গে ছিল ক্রেস্ট, সম্মাননাপত্র ও দুই লাখ টাকা। অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে জানান, লুৎফর রহমানকে সরকারি অবসরভাতা দেওয়া হবে। তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নন। তার স্বীকৃতিটি তাই বিশেষ ক্যাটাগরিতে।
লুৎফর রহমানের জন্ম ১৯৫২ সালে ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামে। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের মানুষের জীবন নদীর মর্জির ওপর নির্ভর করে। তার পরিবারও ছিলো নদীনির্ভর। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, চরে তাদের শত বিঘার বেশি আবাদি জমি ছিল। নদী একে একে সবই কেড়ে নেয়। ১৯৭৪ সালের বন্যা ও ভাঙনে হারান বসতভিটাও। বিভিন্ন চর ঘুরে শেষে পারবাগুড়িয়ায় তিন শতাংশ জমিতে ঠাঁই মেলে। সেখানে ওয়াপদা বাঁধের পাশে একটি ছোট টিনের ঘরেই আজও তার সংসার।
বাবা-মায়ের কনিষ্ঠ সন্তান লুৎফর বহু কষ্টে স্কুলজীবন পার করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। কলেজে পড়ার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু চরম দারিদ্র্যের কাছে হার মানতে হয়েছে। সেই না-পাওয়া থেকেই তার প্রতিজ্ঞা, ‘আমার মতো আর কোনো শিশু যেন টাকার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ না করে।’
ম্যাট্রিকের দুই বছর পর, ১৯৭৪ সালে শুরু হয় তার পাঠশালা। গ্রামের স্কুলছুট ও দরিদ্র ঘরের শিশুদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে পড়াতেন। বিনিময়ে নিতেন এক-দুই মুষ্টি চাল। পরে চালের বদলে ঠিক হয় প্রতীকী মূল্য, দৈনিক এক টাকা।
এই হিসাবের পেছনে আছে এক সরল যুক্তি। তার ভাষ্য, পুরোপুরি বিনামূল্যে পড়ালে শিশুদের মধ্যে নিয়মিত পড়ার তাগিদ কমে যেতে পারে। আবার বড়ো অঙ্কের ফি দেওয়ার সামর্থ্য এই এলাকার অভিভাবকদের নেই। এক টাকা তাই মূল্য নয়, সম্পর্কের বন্ধন। সেটুকুও অনেক দিন কেউ দিতে পারেননি। স্থানীয় এক নারী বলেন, ‘এক টাকাও কেউ দিছে, কেউ দেয়নি তাও তিনি পড়াইছেন।’
প্রতিদিন সকালে সাইকেলে বা পায়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়েন তিনি। পারবাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, চন্দিয়া, কঞ্চিপাড়া, মধ্যপাড়া, পূর্বপাড়াসহ আশপাশের সাত-আটটি গ্রামে ঘুরে ঘুরে পড়ান ৩০-৪০ জন শিশুকে। কখনো গাছের ছায়ায়, কখনো রাস্তার ধারে, কখনো নদীর বাঁধে বসে যায় ক্লাস। সকাল-সন্ধ্যায় নিজ বাড়ির বারান্দায়ও বসে তাঁর ‘মিনি পাঠশালা’। রোদ-বৃষ্টি বা শরীরের দুর্বলতা কিছুই তাকে আটকাতে পারেনি।
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়শা আক্তার বলে, ‘পড়তে না এলে স্যার আমাদের খোঁজ নেন। আমরা না গেলে নিজেই বাড়ি গিয়ে ডাকেন।’ রুপা নামের আরেক শিক্ষার্থীর কথায়, ‘না বুঝলে বারবার বুঝিয়ে দেন, যতবার লাগে।’
অভিভাবক জয়নব বেগম মনে করিয়ে দেন বাস্তবতার হিসাব, ‘একজন শিশুকে এখন মাসে দেড় হাজার টাকা দিয়ে প্রাইভেটে পড়াতে হয়। লুৎফর স্যার নামমাত্র টাকায় পড়ান। তার ছাত্ররা এখন ডাক্তার, পুলিশ, বিসিএস কর্মকর্তা।’ এলাকায় এমন পরিবার আছে, যেখানে দুই প্রজন্মই তাঁর কাছে পড়েছে। একসময়ের ছাত্রদের সন্তানেরা এখন তার সামনেই বসে বর্ণমালা শেখে।
আলোর এই কারিগরের ঘরে আলো কম। স্ত্রী লতিফুন বেগম, দুই ছেলে ও দুই মেয়ের সংসার চলে টানাটানিতে। বড়ো ছেলে লাভলু মিয়া অটোরিকশা চালান। ছোট ছেলে মশিউর দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত পড়েছেন। সাইকেলটি প্রায় অচল, পুরোনো মোবাইল ফোনও বন্ধ। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখাও কঠিন।
এক শুভাকাঙ্ক্ষী জানান, তিনি বড়ো অভিমানী মানুষ। ক্ষুধা পেলেও মুখ ফুটে বলেন না, কেউ টাকা দিতে চাইলে নিতে চান না। ‘আমি মাঝে মাঝে চায়ের টাকাটা জোর করে দেই’ বলেন তিনি। লুৎফর রহমানের নিজের কথা, ‘শিশুদের পড়াতে গেলেই অভাবের কথা ভুলে যাই। এটা আমার নেশা।’
সম্মাননা নিয়ে গ্রামে ফেরার পর পারবাগুড়িয়ায় বরণ করে নেওয়া হয় তাকে। যাঁদের ভাই-বোন বা সন্তান তার কাছে পড়েছে, তারা এসে দাঁড়ান পাশে। এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের দুই ভাইকে তিনি পড়িয়েছেন। আমাদের মতো অনেক ছেলেমেয়েকে উনি পড়িয়েছেন।’
লুৎফর রহমান নিজে অবশ্য হিসাব করেন সরল ভাষায়, ‘প্রধানমন্ত্রী ওয়াদা করেছেন, আমাকে অবসরভাতা দেবেন। ভাতা দিলে ওইটাই আমার সম্বল।’ দুই লাখ টাকাকে তিনি বলছেন ‘অ্যাডভান্স’। বড়ো ছেলে লাভলু বলেন, ‘আব্বাকে সম্মানিত করেছেন, এতে আমাদের পরিবারসহ সবাই খুব আনন্দিত।’
স্থানীয় শিক্ষাঙ্গণের মানুষেরাও এই স্বীকৃতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। জিইউকে রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ লেখক-গবেষক জহুরুল কাইয়ুম বলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন একজন গুণী মানুষের মূল্যায়ন, শিক্ষকতা জীবনের বড়ো প্রাপ্তি। সংস্কৃতিকর্মী মানিক বাহারের ভাষায়, লুৎফর রহমান ‘শুধু শিক্ষক নন, সমাজের আলোকবর্তিকা’।
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁর বাড়িতে এখন ‘এক টাকার স্কুল’ নামে নতুন পাঠশালা নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে গাছতলা আর বারান্দার ক্লাস পাবে একটি স্থায়ী আশ্রয়। এলাকার দরিদ্র শিশুরা বড়ো পরিসরে বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ পাবে। তার সম্মাননা নিয়ে শিক্ষাবিদেরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক পদ না থাকলেও নিবেদিত শিক্ষকের কাজ মূল্যায়ন পায়। এতে শিক্ষক সমাজেরই মর্যাদা বাড়ে।
অভাব, ভাঙন আর বার্ধক্যের মাঝেও লুৎফর রহমানের কাছে শিক্ষা কখনো পেশা হয়ে ওঠেনি। যে সময়ে প্রাইভেট টিউশন অনেকের কাছে বাণিজ্য, সেই সময়ে এক টাকার বিনিময়ে তার পাঠদান এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত।
পুরস্কার বা ভাতা তার লক্ষ্য নয়। গাইবান্ধার চরের পথে খাতা-কলম হাতে হাঁটতে হাঁটতে তিনি আজও একটা কথাই বলেন, ‘যতদিন বাঁচি, ততদিন পড়াবো। আলোর কাজ থামবে না।’
