![]()
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় জেলা বিএনপির সভাপতি এমএ মজিদের ভাই, চাচাতো শ্যালক ও শ্যালকের স্ত্রীর নাম রয়েছে। তবে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করে দেখার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে নতুন সার ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর এ নিয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, কালীগঞ্জ উপজেলার দুটি ইউনিয়নে এমএ মজিদের দুই আত্মীয়ের নাম রয়েছে। অন্যদিকে হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তাঁর ভাই আব্দুল লতিফ।
কালীগঞ্জে দুই আত্মীয়ের নাম
প্রকাশিত তালিকায় কালীগঞ্জ উপজেলার শিমলা-রোকনপুর ইউনিয়নে মেসার্স নাজমুল ট্রেডার্সের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন নাজমুল হক মিশু। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি এমএ মজিদের চাচাতো শ্যালক। একই উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নে সাদ ট্রেডার্সের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন এমএ মজিদের বড় শ্যালক মাহমুদ হাসান লিটনের স্ত্রী সুরমা হাসান।
প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, নাজমুল হক মিশু কালীগঞ্জ শহরের বিহারী মোড় এলাকায় রড-সিমেন্টের ব্যবসা করেন। অন্যদিকে সুরমা হাসান গৃহিণী। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তালিকায় তাঁদের নাম জেলা কমিটির সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
তবে অভিযোগ উঠেছে, এই দুই আবেদনকারীর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে স্থায়ী বসবাস এবং ডিলারশিপ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক অবকাঠামো থাকার শর্ত পূরণ হয়নি।
হরিণাকুণ্ডুতেও নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নে মেসার্স একতা ট্রেডার্সের নামে সার ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন এমএ মজিদের ভাই আব্দুল লতিফ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুল লতিফকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
নীতিমালায় কী বলা আছে?
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের কার্যালয় থেকে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫’ অনুসারে আবেদন আহ্বান করা হয়।
আবেদনের শর্তে বলা হয়েছিল, আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। পাশাপাশি নিজস্ব অথবা ভাড়ায় নেওয়া অন্তত ৫০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদামঘর থাকতে হবে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কালীগঞ্জের সংশ্লিষ্ট দুটি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব এবং আবেদনকারীদের স্থায়ী ঠিকানা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কী বলছেন নিয়োগ পাওয়া একজন?
শিমলা-রোকনপুর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া নাজমুল হক মিশু স্বীকার করেছেন, তিনি এমএ মজিদের আত্মীয়। তিনি আরও জানান, এর আগে তিনি সারের ব্যবসা করেননি এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে তাঁর কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না।
মিশুর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় চার মাস আগে আবেদন করেছিলেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তিনি কালীগঞ্জ শহরের বিহারী মোড়ে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলেন।
বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের ক্ষোভ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক নেতা বলেন, জেলা বিএনপির সভাপতির আত্মীয়দেরই যদি ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে অন্য আবেদনকারীদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়ার প্রয়োজন কী ছিল?
তাঁর অভিযোগ, অনেক নেতাকর্মী আবেদন করতে অর্থ ব্যয় করেছেন। কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে আত্মীয়তার প্রভাব থাকলে তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তিনি আরও দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট দুই ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া ব্যক্তিরা আগে সারের ব্যবসা করেননি এবং তাঁরা ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দাও নন।
প্রশাসনের বক্তব্য কী?
কালীগঞ্জ উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, জেলা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁদের বিষয়ে জেলা কমিটি বিস্তারিত বলতে পারবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি এমএ মজিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি নোমান হোসেনও ফোন ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তায় তিনি জানান, সার ডিলার নিয়োগের তালিকা তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির হাতে পৌঁছায়নি। তাই এ বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
তাঁর ভাষ্য, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে যাচাই-বাছাইয়ের পর তিনজনের নাম প্রস্তাব আকারে মন্ত্রণালয় বা কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পাঠিয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরও জানান, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নীতিমালার ব্যত্যয়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সার ডিলার নিয়োগে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় আবেদনকারী ও নেতাকর্মীরা।
