![]()
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার উদ্বেগে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) লেনদেন শেষে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গত প্রায় ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সৌদি আরবে হুথি বিদ্রোহীদের হামলা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) উপকূলে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার আশঙ্কা নতুন করে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৫৫ ডলার বা ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ১১৬ দশমিক ৭২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত ২৯ এপ্রিলের পর এটি ব্রেন্টের সর্বোচ্চ সমাপনী দর।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৮০ ডলার বা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১০৩ দশমিক ২৭ ডলারে পৌঁছেছে। পুরো সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
সৌদি আরবে হামলায় বাড়ছে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
তেলের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিকে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
এলপিএল ফাইন্যান্সিয়ালের প্রধান ক্রস-অ্যাসেট কৌশলবিদ অ্যাডাম টার্নকুইস্টের মতে, সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার আশঙ্কা তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো ধাহরানে অবস্থিত তাদের সদর দপ্তর থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। বাহরাইনের কাছাকাছি উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত এই শহরটি সৌদি আরবের জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনভিত্তিক হুথি বিদ্রোহীদের সংঘাতও নতুন করে তীব্র হয়েছে। ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীর হামলা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
আমিরাতের উপকূলে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্ম আল কুয়াইনের উপকূলে একটি তেলবাহী ট্যাংকার থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা শনাক্ত করেছে দেশটির জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়।
তবে কী কারণে তেল ছড়িয়ে পড়েছে এবং কোন ট্যাংকার এ ঘটনায় জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।
জাহাজ চলাচল-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গত ৯ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল জাজিরা এলাকার পশ্চিমে প্রায় ১৩ নটিক্যাল মাইল বা ২৪ কিলোমিটার দূরে ‘জেম নং ২’ নামের একটি সুপারট্যাংকার অজ্ঞাত কোনো বস্তু বা প্রক্ষেপণের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু লিপো বলেন, গত এক সপ্তাহে ট্যাংকারে ইরানি হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তেলের বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ বাড়লেও পরিস্থিতি যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।
হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে শঙ্কা
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছে।
অন্যদিকে, গত মাসে লোহিত সাগরের প্রবেশপথের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে হুথিদের অগ্রসর হওয়ার পর ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দেওয়া সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেড়েছে।
এই দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সরবরাহ কমে গিয়ে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা সম্ভব। তবে সংঘাতকে ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র
সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে সর্বোচ্চ চার লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল জরুরি ভিত্তিতে বিনিময়ের অনুমোদন দিয়েছে।
লুইজিয়ানার লেক চার্লস এলাকায় ফিলিপস ৬৬-এর একটি শোধনাগারে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮২ সালের পর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলের মজুত সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন এই মজুত থেকে তেল ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে।
এর আগে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর তেলের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড় করেছিলেন।
জার্মানির মজুত থেকেও তেল বিক্রির উদ্যোগ
জ্বালানি সরবরাহের চাপ
