![]()
২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন: ৮.৫% প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কি শুধুই মরীচিকা? | অর্থনীতি ও বাণিজ্য ডেস্ক, টাচবাংলাদেশ
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যখন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন, তখন সবার নজর আটকে ছিল একটি নির্দিষ্ট জায়গায়—আগামী অর্থবছরের জন্য ৬.৫% জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭.৫% মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা। আপাতদৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী মনে হলেও, এটি মূলত সরকারের একটি বৃহত্তর মহাপরিকল্পনার প্রাথমিক ধাপ মাত্র। আর সেই মহাপরিকল্পনাটি হলো—২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ‘ট্রিলিয়ন-ডলারের অর্থনীতি’ বা এক লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা।
মাঝারি মেয়াদের এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীরে লুকিয়ে আছে আরও কিছু চমকপ্রদ লক্ষ্য। সরকার আশা করছে, ২০৩১ অর্থবছর নাগাদ দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে পৌঁছাবে, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নেমে আসবে, মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত হবে, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) জিডিপির ২.৭ শতাংশ হবে এবং কর-জিডিপি অনুপাত বেড়ে ৯.৬ শতাংশে দাঁড়াবে।
কিন্তু অর্থনীতির বর্তমান রূঢ় বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা কি আদৌ সম্ভব?
বিনিয়োগের কঠিন সমীকরণ
ঐতিহাসিকভাবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো ব্যাপক বিনিয়োগ। সরকারের মাঝারি মেয়াদের পরিকল্পনায় ২০৩১ সালের মধ্যে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র বেশ ভিন্ন। বর্তমানে দেশে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ২৭-২৮ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। আর ২০২৭ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২১.৩ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর মানে হলো, আগামী চার বছরের মধ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক বিশাল লাফ দিতে হবে। ইনক্রিমেন্টাল ক্যাপিটাল-আউটপুট রেশিও (ICOR) যদি ৪.৫ ধরা হয়, তবে ৮.৫% হারে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে একটি দেশের জিডিপির অন্তত ৩৮-৪০% সমপরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি সরকার কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ৬.৮% থেকে বাড়িয়ে ২০৩১ সালের মধ্যে ৯.৬%-এ নিয়ে যেতে চায়। এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম কর আদায়ের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বিশাল কাঠামোগত পরিবর্তন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৮ শতাংশের বেশি, যার প্রায় ৮৭ শতাংশই আসতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) কাছ থেকে।
অর্থমন্ত্রী নিজেও এই চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্ট করেই বলেছেন, প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতেই হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, বর্তমানে বিনিয়োগ হাঁটছে উল্টো পথে। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল, ব্যাংকগুলো চরম তারল্য ও সুশাসনের সংকটে ভুগছে এবং জ্বালানি সংকটের কারণে থমকে আছে শিল্প উৎপাদন।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (CPD) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই বাজেটের লক্ষ্যমাত্রাকে সরাসরি অবাস্তব বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন:
“এই বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা এক কথায় অলৌকিক, অবাস্তব এবং অধরা। এই লক্ষ্য ছুঁতে হলে এনবিআরকে এক বছরের মধ্যে তাদের আদায় প্রায় ৪০% বাড়াতে হবে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে একেবারেই অসম্ভব। আমি এই প্রবৃদ্ধির হিসাবগুলোকে ‘পরাবাস্তব’ (surreal) বলব। কারণ, বাজেটের নীতিগত কাঠামোর সাথে বাস্তব আর্থিক কাঠামোর কোনো মিলই নেই।”
সিডনি পলিসি অ্যানালাইসিস সেন্টারের আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক জ্যোতি রহমান মনে করেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দুটি দিক রয়েছে—একটি চক্রাকার (Cyclical) এবং অপরটি কাঠামোগত (Structural)। দীর্ঘদিন ধরে নানা ধাক্কা এবং ভুল নীতির কারণে অর্থনীতি একটি চক্রাকার মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তাঁর মতে, “যখন সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে, অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করবে এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরার একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি হবে, তখন একটি ‘চক্রাকার পুনরুদ্ধার’ আশা করা যেতে পারে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও সার্বিক অর্থনীতিতে কিছুটা গতি আসবে।” তবে ২০৩১ সালের মধ্যে ৮.৫% প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু এটিই যথেষ্ট নয়। এর জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ এবং পুঁজিবাজারে গভীর কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) আকাশকুসুম লক্ষ্যমাত্রা:
উচ্চ প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্য ছুঁতে হলে সরকারকে ২০৩১ সালের মধ্যে এফডিআই (FDI) জিডিপির ২.৭ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। এটি হয়তো সবচেয়ে কঠিন লক্ষ্য, কারণ অর্থনীতির আকার হিসাব করলে এর অর্থ দাঁড়ায় প্রতি বছর প্রায় ১৭-১৮ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আনা!
প্রেক্ষাপটটি একটু পরিষ্কার করা যাক। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ মাত্র ১.৭ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই টানতে পেরেছিল। এমনকি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো বছরেও বিদেশি বিনিয়োগ ৪ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পেরোতে রীতিমতো সংগ্রাম করেছে। অর্থাৎ, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ বর্তমানের চেয়ে ১০ গুণ বাড়াতে হবে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সাবেক লিড প্রাইভেট সেক্টর স্পেশালিস্ট সৈয়দ আখতার মাহমুদ এ প্রসঙ্গে বলেন:
প্রথম শর্ত: নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর নিশ্চয়তা। বারবার নীতি পরিবর্তন করলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন।
দ্বিতীয় শর্ত: ঝামেলাবিহীন জমি ও জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
তৃতীয় শর্ত: যারা ইতোমধ্যে দেশে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের যথাযথ যত্ন নেওয়া। এটিই মূলত বহির্বিশ্বে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।
ভিয়েতনামের মতো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আনতে হলে শুধু বিদেশে গিয়ে মার্কেটিং করলেই হবে না, বরং দেশে বিনিয়োগের বাস্তব পরিবেশে দৃশ্যমান উন্নতি ঘটাতে হবে।
বাস্তবতার কাঠগড়ায় সময়ের চ্যালেঞ্জ:
সংখ্যা বা হিসেবের বাইরে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ‘সময়মতো সংস্কার বাস্তবায়ন’। জ্যোতি রহমানের মতে, বহিরাগত প্রভাবের কারণে অর্থনীতি দ্রুত স্থিতিশীল হতেও পারে। যেমন—মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামলে এবং বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ ধরে রাখার বদলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান শক্তিশালী হতে দিলে মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে ‘স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন’ গঠন এবং ব্যাংক রেজোলিউশন আইনের সংশোধনের মতো সাহসী পদক্ষেপগুলো অর্থনীতিতে জাদুর মতো কাজ করতে পারে।
শেষ কথা:
৮.৫% প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন পূরণে স্রেফ সরকারি ব্যয় বা ভারী ঋণ নেওয়াই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, শক্তিশালী কর প্রশাসন, দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং এমন একটি নিয়ন্ত্রক পরিবেশ যা দেশি-বিদেশি উভয় মূলধনকেই আকর্ষণ করবে।
বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে পারবে কি না, তা কেবল কিছু কাগুজে হিসাব বা সংখ্যার ওপর নির্ভর করছে না। বরং এই স্বপ্নকে ধারণ করার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার কতটা দ্রুত ও শক্তভাবে পুনর্গঠন করতে পারবে, তার ওপরেই নির্ভর করছে আগামীর ভাগ্য।
