![]()
উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের সান্নিধ্যাধীন ভূখণ্ড সেউতায় (Ceuta) চরম সংকট দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মরক্কো থেকে সাঁতরে ও সীমান্ত অতিক্রম করে অন্তত ৬০ হাজার অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করেছেন বলে দাবি করেছেন ভূখণ্ডটির প্রেসিডেন্ট। ভয়াবহ এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পরিস্থিতির বর্তমান চিত্র ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
সেউতার প্রেসিডেন্ট হুয়ান খেসুস ভিভাস পরিস্থিতিকে “অসহনীয়” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, এই ২৪ ঘণ্টায় যত মানুষ ভূখণ্ডটিতে ঢুকেছেন, তা শহরের মোট জনসংখ্যা (প্রায় ৮৩,৬০০) এর প্রায় ৭০ শতাংশের সমান।
যদিও স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাবে অণুপ্ুরবেশকারীর সংখ্যা প্রায় ৫০,০০০ বলে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে স্পেন সরকার।
মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ২৫,০০০-এরও বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে গেছেন। সেউতা থেকে প্রতি মিনিটে গড়ে ১৫০ জন মানুষ পুনরায় মরক্কোর উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছেন বলে জানানো হয়।
কেন এই হঠাৎ অনুপ্রেবেশ?
স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি রায় দিয়েছিল যে, সমুদ্রে বা জলপথে আটক হওয়া অভিবাসীদের সঙ্গে সঙ্গে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না (Summary Deportation করা যাবে না)।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সেউতা সফরকালে বলেন:
“পাচারকারী চক্রগুলো আদালতের এই রায়ের অপব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে, যা ল দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।”
তিনি নিশ্চিত করেন যে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বেআইনিভাবে প্রবেশ করা প্রত্যেককে দ্রুত মরক্কোতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
মানবিক ঝুঁকি ও ভয়াবহতা
সীমান্তে নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে হাজার হাজার তরুণ, নারী ও শিশু উপকূলে পৌঁছায়। যাদের মধ্যে অন্তত ৭,০০০ শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বেশিরভাগ অভিবাসীই মরক্কো উপকূল থেকে সাঁতরে সেউতার তীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিতে গিয়েই ডুবে ও পদদলিত হয়ে অন্তত ৩৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
মরক্কো ফেরত এক অভিবাসী রয়টার্সকে জানান:
“পরিস্থিতি মোটেও ভালো বা আনন্দদায়ক নয়। এখানে চোখের সামনে মানুষ মারা যাচ্ছে। যারা এখনো আসার পরিকল্পনা করছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ— দয়া করে আসবেন না।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন
-
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU): ইইউ প্রধান আরসুলা ফন ডার লিয়েন এ ঘটনাকে “অনভিপ্রেত ও অত্যন্ত উদ্বেগজনক” হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে সীমান্ত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
-
ইতালি: ইতালির ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এটিকে ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য হুমকি আখ্যা দিয়ে স্পেনের সাথে শেনজেন মুক্ত-চলাচল চুক্তি (Schengen Area) স্থগিতের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
-
স্পেন: ইতালির প্রতিক্রিয়াকে “অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত” আখ্যা দিয়ে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাদ্রিদে নিযুক্ত ইতালীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছেন।
সেউতার ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক পটভূমি
মরক্কোর উত্তর উপকূলে অবস্থিত সেউতা ও মেলিলা পঞ্চদশ শতক থেকেই স্পেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ১৯৯৫ সাল থেকে এগুলো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। আফ্রিকার মহাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত এই দুই ভূখণ্ডেই বিদ্যমান। দীর্ঘকাল ধরে উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এগুলো স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
