![]()
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বোমা-সদৃশ ও সন্দেহজনক পরিত্যক্ত বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মেট্রোরেল স্টেশন, ধর্মীয় শোভাযাত্রার পথ, সরকারি ভবন ও জনবহুল এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করে এ ধরনের ঘটনা ঘটায় সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
যদিও প্রতিটি ঘটনার পর পুলিশ ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)-এর বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল দ্রুত এলাকা ঘিরে ফেলে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব বস্তুতে কোনো বিস্ফোরক না পাওয়া গেলেও সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে আতঙ্ক কাটছে না।
মতিঝিলে উদ্ধার হওয়া বস্তুটি ছিল তাজা আইইডি
সবচেয়ে উদ্বেগের ঘটনাটি ঘটে গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে। ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হওয়া উল্টোরথের শোভাযাত্রা ওই এলাকা অতিক্রম করার কথা ছিল। সেখানে আনসার সদস্যদের সতর্কতায় একটি জেনারেটর রুমের পাশে পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে একটি তাজা আইইডি (ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বা পাইপ বোমা উদ্ধার করা হয়।
শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া দর্শনার্থীদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা এড়াতে সে সময় পুলিশ কৌশলে এটিকে ‘শর্ট সার্কিট’ বলে প্রচার করে এবং পরবর্তীতে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ডিভাইসটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে। এই ঘটনায় মতিঝিল থানায় বিস্ফোরক আইনে মামলা করা হয়েছে।
সিটিটিসি জানায়, উদ্ধার হওয়া বোমার ভেতরে সালফার, বেয়ারিং বল, তারকাঁটা ও ধারালো লোহার টুকরো ছিল। একটি বৈদ্যুতিক সার্কিটের সঙ্গে ছাতার বোতাম সংযুক্ত করা হয়েছিল, যাতে ছাতাটি খুললেই বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে। বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় স্প্লিন্টারের আঘাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মী আহত হন।
আশুলিয়ায় প্রেসার কুকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে আতঙ্ক
মতিঝিলের ঘটনার পরদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে একটি পরিত্যক্ত বস্তা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে সেটি পরীক্ষা করে ক্ষতিকর কিছু পাওয়া যায়নি।
এর পরদিনই অর্থাৎ ৩০ জুলাই রাতে আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকায় একটি চায়ের দোকানের সামনে পরিত্যক্ত প্রেসার কুকার উদ্ধার করা হয়। পরে ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল সেটি নিষ্ক্রিয় করে। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় বিস্ফোরক দমন আইনে মামলা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম।
মিরপুর ও ফার্মগেটে ভুয়া আতঙ্ক (হক্স)
শনিবার (১ আগস্ট) সকালে মিরপুর-১০ এবং ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে দুটি বোমাসদৃশ বস্তু পড়ে থাকার খবরে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তল্লাশি চালায়।
মিরপুরে বিশেষ ফ্র্যাঞ্জিবল ডিসরাপ্টর ব্যবহার করে ব্যাগটি নিষ্ক্রিয় করার পর দেখা যায়, ভেতরে কেবল একটি জর্দার কৌটা ও পান রাখা ছিল। অন্যদিকে ফার্মগেটে পাওয়া সন্দেহভাজন বস্তাটিতে কিছু পরিত্যক্ত ময়লা-আবর্জনা ছাড়া কিছুই মেলেনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
ঘটনাগুলোর বিষয়ে ডিএমপির সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানান, “আমরা সংবাদ পাওয়ার পরপরই নিরাপত্তা জোরদার করি এবং অত্যাধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে পরীক্ষা চালাই। মিরপুর ও ফার্মগেটে পাওয়া বস্তুগুলো কোনো বিস্ফোরক ছিল না; সেগুলো ছিল স্রেফ পান-সুপারির কৌটা ও আবর্জনা। জননিরাপত্তায় কোনো ঝুঁকি নেই।”
তিনি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সন্দেহভাজন কিছু দেখলে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করেন। পাশাপাশি, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কারা এসব বস্তু রেখে যাচ্ছে তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানান।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, রথযাত্রা বা মেট্রোরেলের মতো জায়গাগুলোকে কেন লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে—এসবের পেছনে গভীর তদন্ত প্রয়োজন। এটি কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের তৎপরতা, রাজনৈতিক এজেন্ডা, জনমনে ভয় সৃষ্টির অপচেষ্টা কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা পরীক্ষার কৌশলও হতে পারে।”
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ।
