![]()
ফ্রান্সে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কার ও অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ কমানোর দাবিতে শুরু হওয়া উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মঙ্গলবার আরও সহিংস রূপ নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। আন্দোলনকে ঘিরে দেশটির ক্ষমতাসীন সরকার ও বিরোধী কট্টর-বামপন্থি শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।
সংবাদ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, সোমবার পর্যন্ত ফ্রান্সের প্রায় ১৮০টি উচ্চবিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এবং সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে অন্তত ১৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আন্দোলনের সূত্রপাত ও শিক্ষার্থীদের দাবি
গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রেতেই অঞ্চলের একটি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর অভাবের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা প্রথম রাজপথে নামে। পরবর্তীতে প্যারিস অঞ্চল ছাড়িয়ে আন্দোলন পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের প্রধান অভিযোগ—বিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষকের সংকট রয়েছে এবং বহু ভবনের অবকাঠামো অত্যন্ত জরাজীর্ণ। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ তাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি তৈরি করছে। সংকট নিরসনে শিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছে তারা।
মঙ্গলবার শিক্ষার্থীরা দেশজুড়ে বিদ্যালয় অবরোধের কর্মসূচি পালন করে। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন স্কুলের প্রধান ফটক অবরুদ্ধ করে রাখে। আলপ-মারিতিমসহ একাধিক অঞ্চলে শিক্ষার্থীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করে এবং কতিপয় স্থানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আলপ-মারিতিম থেকে পুলিশ অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থীকে আটক করেছে। সোমবার পর্যন্ত অন্তত ১৫টি বিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।
সরকার ও বিরোধীদের পাল্টাপাল্টি তোপ
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে ঘিরে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লকুরনু এবং কট্টর-বামপন্থি দল ‘ল্য ফ্রঁস ইনসুমিজ’-এর প্রধান জঁ-লুক মেলেনশোর মধ্যে সরাসরি বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী লকুরনু অভিযোগ করেছেন, বিরোধী কট্টর-বামপন্থি নেতারা সহিংসতায় উসকানি দিচ্ছেন। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে, তবে আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।”
অন্যদিকে, জঁ-লুক মেলেনশো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “আমাদের তরুণদের স্পর্শ করবেন না।” তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারের কঠোর অবস্থানকে ‘বর্ণবাদী প্রবণতা’ বলে অভিহিত করেন এবং নিজের সমর্থকদের এই আন্দোলনে সংহতি জানানোর আহ্বান জানান।
মেলেনশোর এই বক্তব্যকে ‘অপমানজনক’ উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক থেকে শুরু করে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ কর্মকর্তা—সবার নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও ২০২৭ সালের নির্বাচন
এই ছাত্র বিক্ষোভ এমন একসময়ে ফ্রান্সকে গ্রাস করেছে যখন দেশটি ২০২৭ সালের বাজেট প্রণয়ন নিয়ে চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকটে সাধারণ মানুষ যখন দিশেহারা, তখন সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা করছে ম্যাক্রোঁ সরকার।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ফ্রান্সের সরকারি ঋণ রেকর্ড ৩.৫৯৬ ট্রিলিয়ন ইউরোতে গিয়ে ঠেকেছে—যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১৯ শতাংশ। ঋণ সামাল দিতে বাজেট ঘাটতি কমানোই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে, আগামী ২০২৭ সালের ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশটির পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ আর প্রার্থী হতে পারছেন না। ফলে ২০২২ সালের নির্বাচনে তৃতীয় হওয়া জঁ-লুক মেলেনশো এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে সচেষ্ট।
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভ এখন কেবল শিক্ষার দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ফ্রান্সের ভঙ্গুর অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় বাজেট এবং আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক বিশাল রাজনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
