![]()
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের চাপ, অ্যাসাইনমেন্ট আর জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষাগুলোর ভিড়ে অনেকেই যখন ক্যারিয়ার গড়তে ব্যস্ত, তখন একদল তরুণ মেতে উঠেছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে। নিজেদের টিউশন আর পকেটমানির টাকা জমিয়ে, টানা দুই বছরের পরিশ্রমে তারা বানিয়ে ফেলেছেন একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এই যৌথ প্রয়াসের ফসল ‘অন্যপাতা’ মুক্তি পেতে যাচ্ছে আসন্ন দুর্গাপূজায়।
এসজেএ প্রোডাকশনের ব্যানারে নির্মিত ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই সিনেমাটি সম্প্রতি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা poster, মোশন ভিডিও ও অফিসিয়াল পোস্টার প্রকাশের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। খুব শিগগিরই সিনেমাটির অফিসিয়াল ট্রেলার ও গান মুক্তি পাবে বলে জানিয়েছেন এর নির্মাতারা।
ছয়জন থেকে ৪০ জনের দল
সিনেমাটি তৈরির গল্পটাও কোনো চলচ্চিত্রের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। মাত্র ছয়জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে শুরু হয়েছিল সিনেমা বানানোর কাজ। তবে সময়ের সাথে সাথে যুক্ত হতে থাকেন অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীর এক যৌথ উদ্যোগে রূপ নেয় প্রজেক্টটি।
পড়াশোনার তীব্র চাপ সামলানোর পাশাপাশি অর্থসংকট ছিল এই তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্পন্সর কিংবা বাইরে থেকে আসা বড় কোনো অর্থায়ন ছাড়াই নিজেদের উপার্জিত টিউশন ও পকেটমানির টাকায় একে একে শেষ হয়েছে শুটিং, সম্পাদনা ও পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ।
গল্প ভর্তিযুদ্ধের, গল্প অস্তিত্বের
‘অন্যপাতা’র মূল উপজীব্য বিষয় বাংলাদেশে আয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। দেশজুড়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর এই ভর্তিযুদ্ধের পেছনে থাকা পরিচয় সংকট, পারিবারিক ও সামাজিক চাপ, কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া এবং একই সঙ্গে ছাত্রজীবনের প্রেম-ভালোবাসার নানা দিক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সিনেমাটিতে।
সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা যাবে দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাওয়া এক তরুণকে। সেই কঠিন সংগ্রামের পথেই তার জীবনে আসে ভালোবাসা। বাস্তব জীবনের দুটি সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমাটির গল্প ও চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন পরিচালক মো. শাহেজাহান এ্যানি, যিনি নিজে চুয়েটের শিক্ষার্থী।
পরিচালক মো. শাহেজাহান এ্যানি বলেন, “আমাদের দেশের সিংহভাগ শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংগ্রামের সময় কাটে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার দিনগুলোতে। সেই সময়ের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে অনেকেরই অনেকটা সময় লেগে যায়। ভর্তিযুদ্ধের সেই কঠিন সময়ে টিকে থাকার এক মিষ্টি অভিজ্ঞতার গল্পই ‘অন্যপাতা’।”
জেন-জি প্রজন্মের ভাষায় ভিন্ন গল্প বলা
নির্মাতাদের দাবি, প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে খুব সহজ ও সাবলীলভাবে গল্পটি দর্শকদের সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন তারা।
সিনেমাটির প্রযোজক চুয়েট শিক্ষার্থী অংকন দে অনিমেষ ও বুয়েট শিক্ষার্থী সামস আবতাহী ইসমাম বলেন, “‘অন্যপাতা’র গল্পটা দর্শকদের খুব চেনা মনে হলেও এর ভিজ্যুয়াল ও উপস্থাপনার অভিজ্ঞতা একেবারেই নতুন। আমাদের জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্মের কথাবার্তা ও অনুভূতির ছাপ পুরো সিনেমাতেই রয়েছে। তবে এটি এমন এক সরল ও ফ্রেশ গল্প, যা সব বয়সের দর্শকদেরই হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।”
সিনেমাটিতে থাকছে ছয়টি মৌলিক গান ও বিশেষ আবহসংগীত। পাশাপাশি সিনেমা জুড়ে চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের নানা অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পর্দায় সিনেমাটিক স্টাইলে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
নেপথ্যে যারা রয়েছেন
সিনেমাটির প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়া শাকিল ও প্রত্যাশা ঘোষ। অন্যান্য চরিত্রে দেখা যাবে শাইম, নোমান, অনিমেষ, একুশী, ইমরান, মনন ও রোবেনকে।
কারিগরি দিকগুলোতেও কাজ করেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা:
-
শিল্প নির্দেশনা: ইন্দ্র নীল (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)
-
চিত্রগ্রহণ: ইব্রাহিম বিন আনছারী
-
সংগীত পরিচালনা: ফাহরিয়াজ তাসজিম মনন (ছয়টি গান)
-
আবহসংগীত: আইনান
-
পোস্ট প্রোডাকশন ও কালার এডিটিং: তানভীর জানি (চুয়েট)
-
কাস্টিং পরিচালক: নোমান আহমদ রনি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
-
লাইন প্রোডাকশন: সুদীপ্ত পাল (এইচএসসি শিক্ষার্থী)
নিজের স্বপ্ন, বিশ্বাস আর সংগ্রামের ওপর ভর করে নির্মিত এই সিনেমাটি দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হতে যাচ্ছে তরুণ এই নির্মাতাদের। দুর্গাপূজার আমেজে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকরা কীভাবে এই তরুণদের প্রচেষ্টাকে গ্রহণ করেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
