![]()
ঢাকার লালবাগ রাজস্ব সার্কেল ভূমি অফিসে মিস কেসের নকল সরবরাহের নামে একজন সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাশেদ নামের এক ওমেদারের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারী মো. উজ্জ্বল জানিয়েছেন, নকলটির সরকারি ফি ২০ টাকা। তবে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি)।
সরেজমিনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে লালবাগ রাজস্ব সার্কেল সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের নিচতলায় সিঁড়ির পাশে উজ্জ্বলের হাতে একটি মিস কেসের নকল তুলে দেন রাশেদ। এরপর তাঁদের মধ্যে টাকা লেনদেন হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত যুগান্তরের প্রতিবেদক টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রাশেদ বলেন, নামজারি-সংক্রান্ত একটি মামলা করার জন্য তিনি ১ হাজার ৯০০ টাকা নিয়েছেন। এ সময় টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেননি তিনি। পরে কথা না বাড়িয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে যান রাশেদ। এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বলে জানিয়েছে যুগান্তর।
কী বলছেন অভিযোগকারী?
লালবাগের বাসিন্দা মো. উজ্জ্বল জানান, জমিসংক্রান্ত একটি মিস কেসের নকল সংগ্রহ করতে তিনি ভূমি অফিসে যান। সেখানে রাশেদ নিজেকে ভূমি অফিসের লোক পরিচয় দিয়ে নকল সরবরাহের কথা বলেন।
উজ্জ্বলের অভিযোগ, প্রথমে তিনি ১ হাজার ৫০০ টাকা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাশেদ ওই পরিমাণ টাকা নিতে রাজি হননি। পরে ১০০ টাকা করে কয়েক দফায় অর্থ দেওয়ার পর মোট ১ হাজার ৯০০ টাকা নেওয়া হয়।
উজ্জ্বলের দাবি, নকলটির সরকারি ফি মাত্র ২০ টাকা। ফলে সরকারি ফি ও তাঁর দেওয়া অর্থের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।
ভূমি অফিসে দালালচক্রের অভিযোগ
ভূমি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাশেদ প্রায় ১০ বছর ধরে লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের কার্যালয়ে যাতায়াত করেন। লালবাগ ছাড়াও ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও তেজগাঁওয়ের বিভিন্ন ভূমি কার্যালয়ে জমিসংক্রান্ত কাজ করিয়ে দেওয়ার নামে তিনি দালালি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন ও রাসেল নামের আরও দুজন ব্যক্তি জমিসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে সহায়তা করেন। তাঁদের মধ্যে সুমন কম্পিউটার-সংক্রান্ত কাজ করেন বলে জানা গেছে। রাসেলকে অফিসের ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচয় দেওয়া হলেও তিনি ওমেদার হিসেবে পরিচিত বলে সূত্রের দাবি।
এ ছাড়া জহিরুল ইসলাম নামের আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিভিন্ন কর্মকর্তার মাধ্যমে কাজ করিয়ে দেওয়ার সমঝোতা করার অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সেবাগ্রহীতা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত অর্থ না দিলে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে ফাইল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁদের অভিযোগ, অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কিছুদিন আড়ালে থাকলেও পরে আবার কার্যালয়ে আসেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
নকল সংগ্রহ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে অমিল
মিস কেসের নকলটি কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মিস কেসের নকলসংক্রান্ত কাজের সঙ্গে মিউটেশন শাখার মিস কেস সহকারী ও নাজিরের দায়িত্বে থাকা এস এম আরিফুর রহমান যুক্ত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফুর রহমান প্রথমে রাশেদকে চেনেন না বলে জানান। পরে ভিডিও দেখানো হলে তিনি বলেন, রাশেদ স্টেশনারি, দলিল-সংক্রান্ত স্ট্যাম্পসহ বিভিন্ন কাজ করেন এবং মাঝেমধ্যে অফিসে আসেন।
উজ্জ্বলের কাছ থেকে নেওয়া নকলটি তাঁর কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে আরিফুর রহমান বলেন, তাঁর কাছ থেকে নকল নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, রাশেদ দাবি করেছেন, তিনি আরিফুর রহমানের কাছ থেকেই নকলটি সংগ্রহ করেছেন। তবে এ জন্য আরিফুর রহমানকে কোনো টাকা দেননি বলে জানান তিনি। নকলটির উৎস সম্পর্কে দুজনের বক্তব্যে এভাবে অমিল দেখা গেছে।
রাশেদের দাবি, এটি তাঁর জীবিকার অংশ
পরবর্তীতে ফোনে যোগাযোগ করা হলে রাশেদ বলেন, তিনি একা নন; সুমন ও রাসেলও ভূমি অফিসে জমিসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ করেন। তাঁর ভাষ্য, এসব কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করেন।
তবে টাকা নেওয়ার পরিমাণ নিয়ে তাঁর বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। ঘটনাস্থলে তিনি ১ হাজার ৯০০ টাকা নেওয়ার কথা বললেও পরে ফোনে ১ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছেন বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, সরেজমিনে জহিরুল ইসলামকেও ভূমি অফিসের দ্বিতীয় তলায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমে রাশেদকে চেনেন না বললেও পরে তাঁকে চেনার কথা স্বীকার করেন জহিরুল। কাজ থাকলে তাঁর কাছে নিয়ে আসেন বলেও জানান তিনি।
কী বলছে ভূমি প্রশাসন?
লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাঁর কার্যালয়ে কোনো ওমেদার নেই।
তাঁর বক্তব্য, কার্যালয়ের কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে লিখিত আবেদন করা যেতে পারে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেকোনো ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ দিতে পারবেন। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি ভূমি কার্যালয়ে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারি ফি সম্পর্কে স্বচ্ছতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা এবং অভিযোগের কার্যকর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
