![]()
চট্টগ্রাম রেলওয়ের প্রায় ৯৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ভুয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তৈরি, শ্রমিককে ঠিকাদার হিসেবে উপস্থাপন এবং জাল নথিপত্র ব্যবহার করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের এ ঘটনায় রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও সীমান্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে সংস্থাটি।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। অনুসন্ধানে ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুয়া নথি তৈরি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে কমিশন।
যেভাবে আত্মসাতের অভিযোগ
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ‘মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশন’ নামে একটি কথিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নথি তৈরি করা হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটির নামে সীমান্ত ব্যাংকে হিসাব খোলা হয় এবং চট্টগ্রাম রেলওয়ে থেকে ৯৭ লাখ টাকার একটি চেক ইস্যু করা হয়।
২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি চেকটি সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় জমা দেওয়া হয়। পরে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে ধাপে ধাপে ওই অর্থ নগদে তুলে নেওয়া হয় বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
তবে রেলওয়ের নথিপত্রে প্রতিষ্ঠানটির নামে কোন কাজের বিপরীতে এত টাকা দেওয়া হয়েছিল, তার উল্লেখ পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
শ্রমিককে ঠিকাদার সাজিয়ে ট্রেড লাইসেন্স
দুদকের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, কথিত প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে কোহিনুর আক্তার নামে এক নারীর পরিচয় ব্যবহার করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডে প্রতিষ্ঠানটির নামে ট্রেড লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয়েছিল।
আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি ও ছবি সংযুক্ত ছিল। তবে অনুসন্ধানে আবেদনপত্রে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রকৃত মালিকের ছবির মিল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দুদক।
সংস্থাটির অনুসন্ধান অনুযায়ী, কোহিনুর আক্তার পেশায় একজন শ্রমিক। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সীমিত এবং তিনি কেবল কোনোরকমে স্বাক্ষর করতে পারেন। নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে—এ বিষয়ে তিনি জানতেন না বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
রেলওয়ের হিসাব শাখায় জাল বিল তৈরির অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে রেলওয়ের প্রধান হিসাব অধিকর্তা (পূর্ব) কার্যালয়ের ডিএফএ/স্টোরস শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, শাখাটির তিন অডিটর পবন কুমার পালিত, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও খোকন চন্দ্র দে একই আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ‘আইবাস++’ ব্যবস্থায় ভুয়া বিল ও টোকেন এন্ট্রি করেন। পরে শাখার হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেনের আইডি ব্যবহার করে বিলটি অনুমোদন করা হয় বলে দুদকের অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
চসিক ও ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
দুদকের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কথিত প্রতিষ্ঠানটির নামে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করেন।
এ ঘটনায় চসিকের লাইসেন্স পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল, সাবেক উপ-কর কর্মকর্তা মঞ্জুর উদ্দিন চৌধুরী এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিনের নাম উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ করেছে দুদক। এ কারণে ব্যাংকটির তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ার, রিলেশনশিপ ম্যানেজার বিদেশ বড়ুয়া এবং কর্মকর্তা মো. পারভেজকে মামলার প্রস্তাবিত আসামিদের তালিকায় রাখা হয়েছে।
যাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে
দুদকের অনুসন্ধানে যাদের নাম এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—
রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী: পবন কুমার পালিত, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, খোকন চন্দ্র দে, মো. মামুন হোসেন, হাবিবুল্লাহ খান, মো. মাকসুদুর রহমান, সৈয়দ সাইফুর রহমান ও মো. আবু নাছের।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা: মুহাম্মদ ইকবাল, মঞ্জুর উদ্দিন চৌধুরী ও মো. জসিম উদ্দিন।
সীমান্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা: গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ার, বিদেশ বড়ুয়া ও মো. পারভেজ।
দুদকের অনুসন্ধানে মোট ১৪ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে দুদক
দুদকের সমন্বিত চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-২-এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে থেকে অভিনব কায়দায় প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়েছে।
তিনি জানান, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভুয়া নথিপত্র তৈরির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়ায় কমিশন মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
তবে মামলা দায়ের ও তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেলে এ ঘটনায় দায় নির্ধারণের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
সূত্র: দৈনিক যুগান্তর ও দুদক-সংশ্লিষ্ট তথ্য।
