![]()
নিউজ প্রোভাইডার
বিশ্বের বুকে জাপান এক সুশৃঙ্খল ও উন্নত জাতির নাম। আর এই অভাবনীয় সাফল্যের মূল ভিত্তি লুকিয়ে আছে তাদের অনন্য শিক্ষাপদ্ধতির গভীরে। জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা কেবল মুখস্থ বিদ্যা বা পুঁথিগত পড়ালেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মূল লক্ষ্য হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরিত্র গঠন এবং নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো। দেশটির প্রাথমিক স্কুলগুলোতে প্রথম ৩ বছর শিশুদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা নেওয়া হয় না। পরীক্ষার নম্বরের বদলে এই সময়ে তাদের সততা, সময়ানুবর্তিতা, পরোপকার এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মতো মানবিক গুণাবলি শেখানো হয়।
জাপানি শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজ গঠনে তাদের শৃঙ্খলার মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ভালো মানুষ গড়ার পাঠ (নৈতিক শিক্ষা)
জাপানে প্রাথমিক স্তরে গণিত, ইতিহাস বা বিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয়ের চেয়ে শিশুদের একজন ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। পশু-পাখির প্রতি যত্নশীল হওয়া, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং বড়দের সম্মান করার মতো মৌলিক আচরণগুলো ছোটবেলা থেকেই তাদের মজ্জাগত করানো হয়।
২. নিজের কাজ নিজে করা (‘ও-সোজী’)
জাপানের স্কুলগুলোতে সাধারণত কোনো পেশাদার পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা ঝাড়ুদার থাকে না। সেখানে ‘ও-সোজী’ (O-soji) নামক এক বিশেষ ঐতিহ্যের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিজেদের শ্রেণিকক্ষ, করিডোর ও টয়লেট পরিষ্কার করে। এই অভ্যাসের ফলে শিশুদের মধ্যে অহংকার দূর হয়, শ্রমের প্রতি সম্মান বাড়ে এবং নিজের চারপাশ পরিষ্কার রাখার গভীর দায়িত্ববোধ তৈরি হয়।
৩. দলগত কাজ ও সহমর্মিতা
জাপানি ক্লাসরুমে কোনো শিশুকে এককভাবে বড় করার চেয়ে দলগত বা যৌথভাবে (Teamwork) কাজ করতে বেশি উৎসাহিত করা হয়। টিফিন ভাগ করে খাওয়া থেকে শুরু করে প্রজেক্টের কাজ—সবকিছুতেই দলগত অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক। এর ফলে ছোটবেলা থেকেই তাদের মনে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব গড়ে ওঠে।
৪. নিয়মানুবর্তিতার কড়া অভ্যাস
শৈশব থেকেই জাপানি শিশুদের নিখুঁত সময় সচেতনতা ও শৃঙ্খলার পাঠ দেওয়া হয়। ঠিক সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হওয়া, যেকোনো স্থানে লাইনে বা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো এবং সমাজের নিয়মকানুন মেনে চলার কড়া অভ্যাস করানো হয়, যা বড় হয়ে তাদের পুরো জীবনের অংশ হয়ে যায়।
৫. সবার জন্য সমান ও অবৈতনিক শিক্ষা
জাপানে বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে শিক্ষার ভূমিকা অনন্য। সেখানে প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের মোট ৯ বছরের শিক্ষা প্রতিটি শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক এবং সম্পূর্ণ অবৈতনিক বা সরকারি খরচে পরিচালিত হয়। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিটি শিশু সেখানে একদম সমান সুযোগ-সুবিধায় বড় হয়।
মূলত এই কঠোর নৈতিক মূল্যবোধ এবং সুশৃঙ্খল শিক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমেই জাপান এমন একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি তৈরি করেছে, যা আজ তাদের বৈশ্বিক ও জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করছে।
