![]()
বন্যাকবলিত এলাকায় পরীক্ষা: আমরা আসলে কাদের পরীক্ষা নিচ্ছি?
প্রতি বছরই আমরা শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দিই যে এইচএসসি (HSC) পরীক্ষা তাদের শিক্ষাজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। কিন্তু এ বছর, আমি নিজেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়েছি—যেখানে একজন শিক্ষার্থী জানেই না সে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবে কি না, সেখানে তাকে কীভাবে পরীক্ষার খাতায় মনোযোগ দিতে বলা সম্ভব? কোমরসমান নোংরা বন্যার পানি ভেঙে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার কথা একবার ভাবুন। হোঁচট খাওয়া, পড়ে যাওয়া, আহত হওয়া—সব পেরিয়ে সম্পূর্ণ ভেজা, ক্লান্ত ও আতঙ্কিত অবস্থায় কেন্দ্রে পৌঁছে তাদের কাছে সেরাটা আশা করা হচ্ছে। আমরা আসলে এই শিশুদের কাছে কী প্রত্যাশা করছি? শুধুই একটি সোনালি জিপিএ-৫?
মেধা বনাম বাস্তবতা: অসম প্রতিযোগিতার চিত্র
হ্যাঁ, এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা ভালো প্রস্তুতি নিয়েছিল বলে পরীক্ষায় ভালো করেছে। তাদের কঠোর পরিশ্রম অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু তারা এই পুরো চিত্রের একটি অংশ মাত্র। বাস্তবতা হলো, প্রস্তুতি যত ভালোই থাকুক না কেন, বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, পরীক্ষা খারাপ হলে শিক্ষার্থীরা সবসময়ই এমন অভিযোগ বা প্রতিবাদ করে থাকে। অন্য যেকোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হয়তো এই যুক্তি মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় হাজার হাজার তরুণ পরীক্ষার্থীকে তাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করার মধ্যে কোনো স্বাভাবিকতা নেই। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি জানি, শিক্ষাকে মৌলিক মানবিক বাস্তবতা থেকে আলাদা করা যায় না। পরিস্থিতি উপেক্ষা করে মেধার বিচার হতে পারে না।
- 🕒 ভিন্ন পরিস্থিতি: ব্রিটিশ কারিকুলামে আন্তর্জাতিক সময়সূচি মানতে গিয়ে অনেককে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মধ্যরাতে বা ঈদের দিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কিন্তু এইচএসসির পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন, কারণ স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সময়সূচি পরিবর্তনের ক্ষমতা রয়েছে।
- 🔄 সুযোগের অভাব: এ-লেভেলের (A-level) কোনো পরীক্ষার্থী বিশেষ কারণে পরীক্ষা দিতে না পারলে পরবর্তীতে তা দেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু এইচএসসিতে একটি পরীক্ষা মিস করার অর্থ হলো পুরো এক বছর পিছিয়ে যাওয়া।
- ❌ অযৌক্তিক তুলনা: প্রকৃতির এই দুর্যোগকে কোনো ‘কার্মার পাঠ’ বা প্রতিশোধ হিসেবে দেখাটা চরম অমানবিক। এটি হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য এক ভয়াবহ বাস্তব সংকট।
আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কী শেখাচ্ছি?
আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে এই ব্যাঘাত নয়, বরং আমরা কী বার্তা দিচ্ছি, সেটি। আমরা সহানুভূতি, ন্যায্যতা এবং দায়িত্ববোধের কথা শেখাই। কিন্তু আমাদের সিস্টেম যখন এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়, তখন আমরা কী দৃষ্টান্ত স্থাপন করছি? কেন তারা ভবিষ্যতে এই জাতির প্রতি দায়িত্বশীল হবে, যখন তারা দেখছে তাদের সংকটের মুহূর্তে খোদ প্রতিষ্ঠানগুলোই সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত? হয়তো পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হবে বা বাতিল করা হবে। কিন্তু যারা শত প্রতিকূলতার পরও ভালো করেছে, তাদের কী হবে? তারাও তো সুবিচার পাওয়ার যোগ্য। শিক্ষা কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটের বিষয় হওয়া উচিত নয়, যেখানে একদল শিক্ষার্থীকে সুবিধা দিতে গিয়ে অন্যদলকে হারতে হয়।
সঠিক সময়ের সিদ্ধান্ত ও মানবিকতার অভাব
সঠিক বিচারবুদ্ধি ও মানবিকতার দ্বারা পরিচালিত একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এই পুরো সংকট এড়াতে পারত। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক খাতের মতোই এখানেও জনরোষ, প্রতিবাদ বা ক্রমবর্ধমান চাপের পরেই কেবল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও আমরা সংকট সমাধানের চেয়ে তা প্রকট হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি। আর এসব প্রতিষ্ঠান যখন আলোচনা ও কালক্ষেপণ করে, তখন এর চরম মূল্য চোকাতে হয় কেবল শিক্ষার্থীদের। শিক্ষা কখনই আমাদের সন্তানদের এটা শেখাতে পারে না যে, কারও কাছ থেকে সহানুভূতি পাওয়ার আগে তাদের অবশ্যই চরম কষ্ট ভোগ করতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থার তুলনামূলক নমনীয়তা ও প্রভাব
| বিবেচ্য বিষয় | জাতীয় কারিকুলাম (HSC) | ব্রিটিশ কারিকুলাম (A-Level) |
|---|---|---|
| সময়সূচি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা | স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে (পরিবর্তনযোগ্য) | আন্তর্জাতিক বোর্ডের হাতে (অপরিবর্তনযোগ্য) |
| পরীক্ষা মিস করার পরিণতি | পুরো এক বছর পিছিয়ে যাওয়া | পরবর্তী সেশনে পুনরায় দেওয়ার সুযোগ |
| দুর্যোগে প্রশাসনের সাড়া | চাপ বা প্রতিবাদের পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ | পূর্বনির্ধারিত গ্লোবাল পলিসি অনুসরণ |
| শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ | চরম (ক্যারিয়ার পিছিয়ে পড়ার ভয়) | তুলনামূলক কম (বিকল্প সুযোগ থাকায়) |
