![]()
স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল
বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি যুদ্ধের নাম নয়; এটি একটি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার মহাকাব্য। ১৯৭১ সালে লাখো মানুষ অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন, হাজারো মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, অসংখ্য পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। সেই সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে জনগণের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় কেবল যুদ্ধের অংশগ্রহণকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; তারা মূলত একটি রাষ্ট্রের জন্মদাতা।
কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে দাঁড়িয়েছে—আমাদের দেশের মুক্তিযোদ্ধারা কি এখনো রাষ্ট্রীয়বাদী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জাতিকে পথ দেখাচ্ছেন, নাকি অনেক ক্ষেত্রে তাদের পরিচয় কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে?
রাষ্ট্রীয়বাদ এমন একটি চিন্তাধারা, যেখানে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়। একজন রাষ্ট্রীয়বাদী মানুষ বিশ্বাস করেন যে রাষ্ট্র ধনী হলে জনগণ শক্তিশালী হবে, রাষ্ট্র নিরাপদ থাকলে জনগণ নিরাপদ থাকবে। একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে জাতি এই রাষ্ট্রীয়বাদী চেতনারই প্রত্যাশা করে। কারণ তারা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন কোনো ব্যক্তি বা দলের জন্য নয়; তারা যুদ্ধ করেছিলেন বাংলাদেশের জন্য।
আজকের বাংলাদেশ নানা ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মতাদর্শগত বিভাজনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। সমাজে মতের ভিন্নতা আছে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, পারস্পরিক অবিশ্বাসও রয়েছে। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন ব্যক্তিত্বদের, যাদের প্রতি দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মান ও আস্থা রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা সেই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তারা চাইলে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হতে পারেন। তারা চাইলে বিভক্ত সমাজকে সংলাপ ও সমঝোতার পথে নিয়ে আসতে পারেন।
দুঃখজনকভাবে, অনেক সময় দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে যায়। এতে মুক্তিযুদ্ধের মহত্ত্ব ক্ষুণ্ন হয় এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছায়। মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পদ নয়; এটি সমগ্র জাতির গৌরব। একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার অবস্থান হওয়া উচিত দলীয় সীমারেখার ঊর্ধ্বে, রাষ্ট্র ও জনগণের পাশে।
আজ দেশের মানুষ সংঘাত নয়, সমাধান চায়। বিভাজন নয়, ঐক্য চায়। প্রতিহিংসা নয়, সহনশীলতা চায়। আর এই বার্তা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্যভাবে দিতে পারেন মুক্তিযোদ্ধারাই। কারণ তারা জানেন বিভক্তির মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে। তারা জানেন একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের জন্য একটি মূল্যবান শিক্ষা।
মুক্তিযোদ্ধাদের উচিত দেশের সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির মধ্যে সমঝোতার সেতুবন্ধন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া। তারা জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন যে স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে।
রাষ্ট্রীয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, একজন মুক্তিযোদ্ধার দায়িত্ব যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না। রাষ্ট্রের প্রতিটি সংকটে, জাতীয় স্বার্থের প্রতিটি প্রশ্নে, সামাজিক সম্প্রীতির প্রতিটি প্রয়োজনে তার নৈতিক ভূমিকা রয়েছে। তিনি হবেন সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে এবং রাষ্ট্রের পক্ষে। তিনি কোনো বিভাজনের প্রতিনিধি নন; তিনি জাতীয় ঐক্যের প্রতিনিধি।
আজকের প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে শুধু অতীতের বীরত্বগাথা শুনতে চায় না; তারা বর্তমানের জন্যও দিকনির্দেশনা চায়। তারা জানতে চায় কীভাবে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলা যায়, কীভাবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া যায় এবং কীভাবে মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সবাই মিলে একটি উন্নত বাংলাদেশ নির্মাণ করা যায়। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার নৈতিক অধিকার ও দায়িত্ব মুক্তিযোদ্ধাদেরই সবচেয়ে বেশি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় কোনো সনদ, পদক বা সরকারি তালিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় তার চিন্তায়, তার আদর্শে, তার দায়িত্ববোধে এবং জাতির প্রতি তার অঙ্গীকারে। যে মুক্তিযোদ্ধা আজও রাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন, জনগণের মধ্যে ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেন এবং বিভক্ত জাতিকে একত্রিত করার চেষ্টা করেন, তিনিই প্রকৃত রাষ্ট্রীয়বাদী মুক্তিযোদ্ধা।
বাংলাদেশের সামনে আজ যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলার জন্য জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। আর সেই ঐক্যের পথে সবচেয়ে শক্তিশালী নৈতিক নেতৃত্ব দিতে পারেন মুক্তিযোদ্ধারাই। সময়ের দাবি হলো—তারা এগিয়ে আসবেন, সবাইকে সমঝোতার টেবিলে নিয়ে আসবেন, বিভাজনের দেয়াল ভেঙে জাতীয় সংহতির ভিত্তি শক্তিশালী করবেন।
তখনই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে। তখনই প্রমাণিত হবে যে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা কেবল কাগজে-কলমে মুক্তিযোদ্ধা নন; তারা রাষ্ট্রীয়বাদী মুক্তিযোদ্ধা—যারা অতীতের মতো আজও জাতির পথপ্রদর্শক, ঐক্যের প্রতীক এবং রাষ্ট্র নির্মাণের অন্যতম প্রধান শক্তি।
লেখক: স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল (সিইও, প্রতিষ্ঠাতা: বাংলাদেশ সাপোর্টার্স ফোরাম)
[বি.দ্র. : এটি কারো প্রতি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মতামত রয়েছে। রাষ্ট্রীয়বাদী ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেলের নিজস্ব মতের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা। ]
