![]()
নেত্রকোনা সরকারি কলেজে শিক্ষকসংকটের কারণে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন আট থেকে নয়টি ক্লাস হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে হচ্ছে মাত্র এক থেকে দুটি। একই পরিস্থিতি গণিত, প্রাণিবিদ্যাসহ অন্যান্য বিভাগেও। এতে পাঠ্যসূচি শেষ করা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে।
কলেজের ইংরেজি বিভাগে অনুমোদিত চারটি শিক্ষক পদের মধ্যে দুটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বর্তমানে মাত্র দুজন শিক্ষককে কেন্দ্র করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান চালাতে হচ্ছে। অতিথি শিক্ষক নিয়োগ দিয়েও প্রয়োজনীয় ক্লাস নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী খুসবো তারান্নুমের প্রতিদিন আটটি ক্লাস হওয়ার কথা। কিন্তু নিয়মিত এক থেকে দুটি ক্লাসের বেশি হয় না। চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরান আহমেদের ক্ষেত্রে নয়টি ক্লাসের বিপরীতে গড়ে ক্লাস হয় মাত্র একটি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভালোভাবে বোঝার সুযোগ কমছে। ফলে অনেককে পড়াশোনার ঘাটতি পূরণে প্রাইভেট পড়া ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকসংকট প্রকট
কলেজের ইংরেজি বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের দুটি পদ প্রায় আট বছর ধরে শূন্য রয়েছে। বিভাগটিতে একজন সংযুক্ত শিক্ষক এবং বাইরে থেকে আনা তিনজন অতিথি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালানোর চেষ্টা চলছে।
বিভাগের প্রভাষক কাজী আশরাফুন হুমায়রা জানান, বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩৯টি ক্লাস নিতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় সব ক্লাস নিয়মিত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রভাষক রানা আহমেদ বলেন, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদানের জন্য মানসম্মত অতিথি শিক্ষক পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ পাঠদান নিশ্চিত করতে না পারায় শিক্ষকদেরও খারাপ লাগে।
ইংরেজি বিভাগের এই সংকটের প্রভাব শুধু ওই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি, ডিগ্রি এবং ১৪টি বিষয়ে সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও এর প্রভাবের মুখে পড়ছেন। কারণ, সম্মান শ্রেণির সব বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ১০০ নম্বরের ইংরেজি বাধ্যতামূলক।
গণিত ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগেও সংকট
শিক্ষকসংকটের একই চিত্র দেখা গেছে কলেজের গণিত ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগে। গণিত বিভাগে অনুমোদিত চারটি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন শিক্ষক। উচ্চমাধ্যমিক ও বিএসসি পর্যায় মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থীকে তাঁদের পাঠদান করতে হচ্ছে।
গণিত বিভাগের প্রভাষক শাহীজুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক কম থাকায় নিয়মিত ক্লাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির ওপরও।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগেও চারটি অনুমোদিত পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন দুজন। ফলে একাধিক বিভাগে শিক্ষকসংকটের কারণে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
২৩৭ শিক্ষকের প্রয়োজন, কর্মরত ৩৬ জন
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, একাদশ শ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত নেত্রকোনা সরকারি কলেজে অন্তত ১৫ হাজার ৪৫৪ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। তাঁদের পাঠদানের জন্য প্রয়োজন ২৩৭ জন শিক্ষক। অথচ অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ বাদে অনুমোদিত শিক্ষক পদ রয়েছে ৬৫টি। এর মধ্যে ২৯টি পদ শূন্য। বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক মাত্র ৩৬ জন।
কলেজের উপাধ্যক্ষ মো. আবদুল কাদির ফকির বলেন, সমপর্যায়ের অন্যান্য সরকারি কলেজে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হলেও নেত্রকোনা সরকারি কলেজে সেই সুযোগ হয়নি।
কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবু তাহের খান জানান, শিক্ষকসংকট নিরসনে ১৭০টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব প্রায় দুই বছর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট নিরসনে ছেলেদের জন্য ছয়তলা আবাসিক হল নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া গেছে।
দ্রুত সমাধানের আশ্বাস
শিক্ষকসংকটের বিষয়ে জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
তবে বিভাগের যুগ্ম সচিব জহিরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তাঁদের জানা আছে এবং এ নিয়ে কাজ চলছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকট নিরসনে নতুন পদ সৃষ্টি ও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।
