![]()
কুমিল্লার দেবিদ্বারে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী গঠন এবং নিজ বাড়িতে গোপন নির্যাতনকেন্দ্র পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংসদ সদস্য থাকাকালে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা কিংবা অনিয়মের প্রতিবাদ জানানো ব্যক্তিদের তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। এ ছাড়া নির্বাচনের সময় অস্ত্র প্রদর্শন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখানো এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য জানতে হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি।
শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের রাজনৈতিক উত্থান তার বাবা ফখরুল ইসলাম মুন্সীর হাত ধরে। ২০০৮ সালে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান আরও শক্ত হয়।
২০১৪ সালে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীকে জয়ী হন। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের কাছে পরাজিত হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার সূত্র ধরে শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে নিজের পরিচয় তুলে ধরতেন রাজী ফখরুল। কখনো শেখ রেহানা, কখনো তার ছেলে রাদওয়ান সিদ্দিক মুজিব ববি, আবার কখনো সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তার এবং বড় প্রকল্প ঘিরে তদবির বাণিজ্যে যুক্ত থাকার অভিযোগও উঠেছে। নিয়োগ, সরকারি কেনাকাটা ও বিভিন্ন লাভজনক কাজকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য বা সংশ্লিষ্ট নথি ছাড়া সেগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
নির্বাচনের আগে অস্ত্র প্রদর্শন ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেবিদ্বারের ফখরুল মুন্সী বাড়িতে অস্ত্রধারীদের উপস্থিতি এবং প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, রাজী ফখরুলের সমর্থক ও অনুসারীদের একটি অংশ ওই সময় অস্ত্র প্রদর্শন করে। একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থক এবং সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও ওঠে।
এসব ঘটনার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য কিংবা অভিযোগগুলোর তদন্তসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
চার শতাধিক সদস্যের বাহিনী ও নির্যাতনকেন্দ্রের অভিযোগ
রাজী ফখরুল সংসদ সদস্য থাকাকালে দেবিদ্বারে প্রভাব ধরে রাখতে চার শতাধিক সদস্যের একটি সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, উপজেলা ছাত্রলীগের নেতা রুবেল এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে ওই বাহিনী পরিচালিত হতো। তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানো এবং মারধরের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া রাজী ফখরুলের নিজ বাড়িতে গোপনে নির্যাতনকেন্দ্র পরিচালিত হতো বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কিংবা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানালে কিছু ব্যক্তিকে সেখানে নিয়ে নির্যাতন করা হতো।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ভুক্তভোগীদের অনেকে প্রকাশ্যে অভিযোগ জানাতে সাহস পেতেন না। তবে নির্যাতনকেন্দ্রের অস্তিত্ব ও সেখানে নির্যাতনের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সংসদ ভবনে মারধরের অভিযোগ
রাজী ফখরুলের বিরুদ্ধে সংসদ ভবন এলাকায় এক উপজেলা চেয়ারম্যানকে মারধরের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন সরকারি কাজের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে তার নাম আলোচনায় এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট মামলা, তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে সেগুলোর ভিত্তিতে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে।
বিদেশে অবস্থান করছেন বলে দাবি
একাধিক সূত্রের দাবি, রাজী মোহাম্মদ ফখরুল বর্তমানে থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন। সেখানে ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে তার বর্তমান অবস্থান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ও মেসেঞ্জারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
প্রতিবেদকের নোট: এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। স্বাধীন তদন্ত বা আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।
